Showing posts with label পাঠ প্রতিক্রিয়া. Show all posts
Showing posts with label পাঠ প্রতিক্রিয়া. Show all posts

Monday, August 31, 2020

সুবীর সরকার

 

‘সময়ের উল্টোস্রোতে সাঁতার শিখিনি’
সুবীর সরকার


 
‘কুমোরটুলির দেবদেবীর মুখের ছাঁচে মৃতমুখ
এ মুখে ঘাম নেই
ব্রণ নেই
ভাঁজ নেই
আগ্নেয়গিরির উড়ন্ত ছাই ভাসিয়েছে মানবতাকে’
মাননীয় পাঠক,এই কবিতাটি লিখেছেন তরুণ কবি নীলাদ্রি দেব।পুরো কবিতাটির শরীর জুড়ে দানা দানা সময়ের ভাষ্য ছড়িয়ে আছে।সেই ভাষ্যের ভেতর সময়াতীতের এক অনন্ত নিয়ে ঢুকেই পড়তে হয় পাঠককে।
নীলাদ্রি দেবের প্রথম কবিতার বই-‘ধুলো ঝাড়ছি LIVE’ ২০১৬ তে প্রকাশিত হয়।এই কবিতাটি সেই বইয়ের প্রথম কবিতা।২০২০ তে নুতন করে আবার ‘আলোপৃথিবী’ প্রকাশনা থেকে সেই বইটি আবারও পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।
শুরুর কবিতাটি পাঠ করেই আমরা বুঝে ফেলি সেই ২০১৬ তেই নীলাদ্রি দেব বুঝিয়ে দিয়েছিল,সে বাংলা কবিতা লিখতেই;বাংলা কবিতাতে থাকতেই এসেছে।
আজ নীলাদ্রির পাঠকেরা সেটা নিশ্চিতই বুঝে গেছেন।
১২ টি কবিতায় সাজানো এই বইটির প্রতীকি ও নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন শ্রীহরি দত্ত।
১২ টি কবিতা থেকে ১২ টি মহাসড়ক বেরিয়ে আসে আর পৌঁছতে থাকে জন্ম ও মরণের দিকে।অনন্ত জিজ্ঞাসা আর যাপনের তাড়না কবিকে ধাওয়া করতে থাকে।কবি তার সামগ্রিকতাকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিক্ষত করতে থাকেন।কি এক অস্থিরতা তাকে বুঝি ঘোরের ভেতর ডুবিয়ে মারে।
নষ্টালজিক যুক্তিফাটল দিয়ে নীলাদ্রি পাথর ঠুকতে ঠুকতে আদিম হয়ে ওঠেন।আর লিখে ফেলেন_
‘হাজার বছরের কান্নায় নদী
সে নদীর তীরে,শ্মশানে
        আমার অস্তিত্বের ছাই
কপালে লেপে রাখি
জলে ছায়া ফেলে দেখি
          অ-পূর্বপুরুষ’
কেমন হিম হয়ে উঠি।শিউরে উঠি।
এক নুতন ভাষায় কবি কথা বলছেন।এক চিরায়ত বোধের ধরাছোঁয়ার খেলা।
কবি লিখছেন_
‘এ হৃদয় এখন পরিযায়ী’
অথচ_
‘সময় বাঁচাতে পারেনি
বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর
   খুঁজে পায়নি আমাকে জীবিত
এখন লাশ
লাশের ভবিষ্যত টানে পরিবার
যদিও পরিবারও একদিন লাশ
 
সময়ের উল্টোস্রোতে সাঁতার শিখিনি’
প্রথম প্রকাশের সময় নীলাদ্রির বয়স ছিল ১৯ বা ২০।আমি বিষ্মিত হই,কি প্রখর সেই বয়সেই নীলাদ্রির দেখা,অনুভূতি আর গূঢ বাস্তবতা মোড়ানো প্যাশনেট।যাপনকথাকে সংহত করে এনে কথাটুকরোর যাদুতে মুড়ে সে বলে ওঠে_
‘প্রেম তলিয়ে যাচ্ছে ডাস্টবিনে
ডিপ ফ্রিজে শক্ত হচ্ছে স্বপ্ন
কর্মব্যস্ত দিনে আধঘন্টা সময় খাচ্ছে
             ধর্ষণ সংবাদ’
বাস্তবকে তুলে আনা।উপস্থাপিত করা।এও তো কবির দায়।অবশ্য একজন কবির কি আদৌ কোন দায় থাকে!
কবি তো অভিশপ্ত।নির্বাসিত অতিথি মাত্র।কাদা হয়ে শুয়ে থাকতে হয় কবিকে ড্রেনের ধারে।
যেমন নীলাদ্রি!তিনি অকপটে লিখলেন_
 
‘মৃত্যু পরোয়ানা চাই
ট্যাগ লাগাচ্ছি দেহে’
যে সময়ে তার জীবনযাপন,যে দেশকালের ভুবনে তাকে বেঁচে থাকতে হয়,যে সমস্ত সাদা ও কালোর মধ্যে তাকে পেরোতে হয় প্রতিদিন;সেই অতিক্রমণের পরতে পরতে সংশয়,ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতা কবিকে অস্থির করে তোলে,তিনি বিপন্ন হন আর ঘুম কিংবা ঘুমহীনতায় লিখে ফেলতে থাকেন,ঘন হয়ে ওঠা তীব্র এক ডিলিরিয়ামের ভেতর_
১।
‘এটিএম মেশিনের ভেতর আমাদের গ্রে ম্যাটার
সৎকারের জন্য লাইন দিয়েছে দালাল’
২।
‘অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে
    যাবতীয় অস্তিত্ব সংকট
কোনওরকম রঞ্জক দাগ কাটে না আর
তবুও শুধুই উদযাপন’?
৩।
‘রাত হয়ে এল
পরজন্মে জোনাকি হব’
তার শব্দব্যবহার,তার বুননের ম্যাজিক,তার অদ্ভূত মায়াবিন্যাস আর সঠিকভাবে থেমে যাওয়া নীলাদ্রিকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।সে তার চলবার রাস্তাটা তার হাঁটবার পথটা ঠিক খুঁজে নিচ্ছেন।
সুররিয়াল কবির মতন কখনো সে লিখছে_
‘দেহ
মন
দুটোই আমার
ব্যবহার করার ধরণ একান্ত ব্যক্তিগত
#
কে তুমি,নীতিনির্দেশদাতা’?
বহুরৈখিক যাপনের আলোআন্ধারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কবি নীলাদ্রি এক নুতনের দিকে,ভাষাপুল ডিঙিয়ে চলে যাচ্ছেন;তার শরীরে পাখির পালক আর জীবন্ত হয়ে থাকা এক নদীর আখ্যান,যা আদতে উপাখ্যানের মতন।
 
ধুলো ঝাড়ছি LIVE
নীলাদ্রি দেব
প্রকাশকঃআলোপৃথিবী
প্রকাশকালঃমার্চ-২০২০

প্রচ্ছদঃশ্রীহরি দত্ত
মূল্যঃ৩০ টাকা













বিরানভূমি,দাবার বোর্ড ও নেক্রপলিস

সুবীর সরকার

 

 

'আজকাল আমাদের গল্প দীর্ঘশ্বাস হয়ে 

ভেসে বেড়ায় নেক্রপলিসে 

 

হেরে গেছি বারবার বিশ্বাস করে 

 

ইদানিং সমস্ত দৃশ্য দাঁতমুখ চেপে 

ভালো আছি, দেখাতে পারি ম্যাজিক 

 

আদতে আমরা জিভহীন জনতা'

#

উপরের কবিতাটি লিখেছেন কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগী।জন্ম ও যাপন উত্তরাঞ্চল।লিখে চলেছেন বাংলা ভাষায়।নিজস্ব স্বর আয়ত্ত তার।তার হাঁটবার রাস্তায় কান্না ও বিষাদের স্বরলিপি।বাংলা কবিতায় পাপড়ির নিজস্ব পাঠক রয়েছে।পরিচিত নাম সে।নিরন্তর নিরীক্ষায় আর কাটাকুটির ভেতর দিয়েই এই কবির জার্নি।একটা তীব্র ঘোর তাড়া করে বেড়ায় পাপড়ি কে।সে ঘোর জড়ানো টানেল দিয়ে তীক্ষ্ণ এক একাকীত্ব নিয়েই হেঁটে যায়,হেঁটে যেতে থাকে রৌদ্র কিংবা কুয়াশায়।নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে খুঁড়তে খুঁড়তে কবি পাপড়ি গুহ নিয়োগী তার জার্নিকে চিরনতুন করে তুলতে থাকেন।শব্দ সচেতন,সময় সচেতন,দেশকাল সচেতন পাপড়ি এক দাবদাহের আর্তি বিছিয়ে দেন পাঠকের চলাচলের পরিসরে।সম্প্রতি সংগ্রহ করি পাপড়ির সদ্য প্রকাশিত এই বইটি।তারপর পাপড়ির অটোগ্রাফ নেই।ছবিও তোলা হয়।ছিলেন তরুণ কবি নীলাদ্রী দেবও।এই বইটি পাপড়ির অন্য বইগুলি থেকে অনেকটাই সরে এসেছে।পলিস বা নগররাষ্ট্রের কালো আগ্রাসনের খাবার নিচে নাগরিকের নিপীড়িত এক  অস্তিত্বসংকট পাপড়িকে উচ্চকিত করে তোলে।আসলে সাম্প্রতিক অস্থিরতা আর মানুষের বিপন্নতায় ভারি হয়ে ওঠা চারপাশ কবিকে ব্যাকুল ও আর্ত করে তুলেছে।পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া এক সময়পর্ব উঠে এসেছে এই 'নেক্রপলিস'-নামক কবিতার বইটিতে।অদ্বয় চৌধুরীর নান্দনিক ও সাংকেতিক প্রচ্ছদের ওপর অনেকটা সময় তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হবেন পাঠক।

নিজের ভেতরের দহ ও দাহ লিখতে লিখতে এক না ফুরোন গল্প শোনান কবি_

‘অন্ধকারে কুকুরের ডাক রপ্ত করে ফেলেছি

আপনি ভাঙা ঘরেও ভিক্ষে চাইছেন’

বাঘিনি পরি,বনসাই,ইঁদুরের গলি,সম্পর্কের জ্যামিতি,লুটেরার হাঁ-মুখ,গরম ভাতের জন্য হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ,ইচ্ছের মৃতদেহ,টাইটানিকের মতো ডুবে যাওয়া,রক্তমুখো মেশিনগানের শব্দ,আর সব নৈরাজ্য পেরিয়ে যেতে যেতে পাপড়ি দেখেন-

‘সম্পর্কের গর্তে চিতা জ্বলছে দেশে’

আর পাপড়ি নিজেকেই ছুঁড়ে দেন এক অমোঘ প্রশ্ন-

‘পাখিদের কি এনআরসি হয়

#

ইতিহাসে প্রমাণিত

জনসংখ্যা চিৎকার করে কাঁদতে পারে না’

আর তাই,নিজের অসহায়তা নিয়েই একজন কবিকে তার যাপনবিন্দুগুলি খুঁড়ে খুঁড়ে এক চূড়ান্ত আশ্রয়হীনতার দিকেই হয়তো চলে যেতে হয়!

কবি তার স্থির ও মগ্ন চোখে উদাসীন হয়ে পড়েন আর বিড়বিড় করে ব্লে ওঠেন-

‘জেনে গেছি

মাথা নীচু করে শাসকের সামনে দাঁড়াতে হয়’

৫১ টি কবিতা দিয়ে নির্মিত এই বইএর চমৎকার এক কথামুখ লিখেছেন স্বপন রঞ্জন হালদার।

 

পাপড়ি, মুগ্ধতা জানালাম আপনার কবিতার প্রতি।


 

নেক্রপলিসঃপাপড়ি গুহ নিয়োগী

প্রকাশকঃবৈভাষিক

মূল্যঃ১২০ টাকা











দেশকালসময়ের অদ্ভুত এক ভাসানযাত্রা
সুবীর সরকার

উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কবিতায় এক প্রখর তারুণ্যের নাম। উত্তরাঞ্চলের কোচবিহারে বসেই সে কাজ করে চলেছে বাংলা কবিতা নিয়েই।অর্জন করেছে নিজস্ব স্বর। নিজস্ব উচ্চারণ।সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নাম ধরে ডাকা বারণ’। তার প্রথম কবিতার বই ‘মৃত্যুর পর যে ঘোড়ায় চড়ে তুমি দেশ পেরোবে(২০১৬)’-টিতেই উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় তার মেজাজ ও জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। নূতন করে আবার পাঠ করলাম চড়ে তুমি দেশ পেরোবে’। খুব সচেতন পাঠকের জন্যই তার কবিতা। অত্যন্ত সময় ও সমাজসচেতন এই কবি চারপাশের সবকিছু, সমস্ত অন্ধকার ও আলোর দিকে সজাগ নজর রেখে চলেন। মানুষের বিষাদ ও বিপন্নতাগুলিকে তীব্রভাবে ছুঁয়ে যান তিনি। তার কবিতা আমাদেরকে ভাবায়।গভীর এক প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। কবি বলেন_
‘আমি চিৎকার করছিলাম শান্ত ধ্বংসস্তূপের কাছে
যে আমাকে আরো গভীরে শুইয়ে দিতে চেয়েছিল’।
কি ঝরঝরে অমোঘ উচ্চারণ! প্রখর মেধার বিচ্ছুরণ তার কবিতায়। মজা, ম্যাজিক ও হিউমার দিয়ে দেশকালসময়ের অন্তর্দেশ চিনিয়ে দিতে থাকেন উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘তার স্বচ্ছ চোখের ভেতর উপচে পড়ছে দুস্তর মরুভূমি। সে
একবার আকাশের দিকে তাকালো এবং মাটির দিকে। গোটা
বিশ্ব যখন জ্বলন্ত খ্যাদ্যের উদাহরণ, সে ঠুকরে ঠুকরে
প্রথমে খেতে শুরু করলো নিজের পরিবার’।
জায়মান এক সুর খেলে বেড়াতে থাকে তার কবিতায়।কত কত দেখা তার। দেখা সমূহ থেকেই নূতন এক জার্নি শুরু করেন কবি। আর আমাদের শোনাতে থাকেন—
‘তোমার স্বপ্ন ঘিরে সারি সারি সাজানো চিতা।
তবুও তুমি ভরসা রাখ তোমার দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপর’।
এই শক্তিশালী কবি বাংলা কবিতাকে তীব্র করে তুলতে তুলতে এক প্রবল বাঁকের দিকে নিয়ে যায়।কবিতার পরতে পরতে তীব্র টান ও টানাপোড়েন গুঁজে দিতে দিতে বাংলা কবিতাকে আবহসঙ্গীতের ভেতর ছেড়ে দিচ্ছেন কবি। আর বলছেন_
‘তুমি যখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠো
আমি বন্ধুত্বের হাত খুঁজি
#
আর সবাই ভয়ংকর ডাকাত হয়ে গেলে
আমার অন্ধকার লোভ হয়’।
মারী ও মড়কের এই দেশ, এই বিশ্ব, প্রতিপল যেখানে ধর্ষিত হয় মানুষ আর মানবতা। পুঁজির দাপটে বিপন্ন হয়ে পড়েন ভূমিলগ্ন জনমানুষ। সেই প্রতারিত ও বিপন্ন মানুষের কথা, তাদের যাপন, তাদের ভাঙা জীবন আর তুমুল স্বপ্ন দেখবার চিরকালীন আকাঙ্খা উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতায় উঠে আসে আন্তরিকভাবেই—
‘এই জায়গাটা আমি চিনি। এই দেশটার নাম
বাবা বলে গেছেন। বাবা বলে গেছেন, এই দেশটা
আমাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, এবং এখানকার
মানুষজন’...
১২ টি কবিতা দিয়ে জমিয়ে তোলা এই বইটির সবচেয়ে বড় দিক হলো উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় তার কবিতায় প্রতিবাদের এক দীর্ঘ সংগীত শুনিয়ে গেছেন, কিন্তু কোন কবিতাই কিন্তু স্লোগান হয়ে যায়নি। তার শব্দের ভেতর সুর ও সুরেলা প্রপাতের ধ্বনি তুমুল আচ্ছন্ন করে তোলে। উদয়ার্ণব লেখেন—
‘এখন গোটা দেশ জুড়ে তুমুল হইচই
আর আমার শহর জুড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর
নারকীয় খেলা
আমাদের ঘুম
আমাদের স্বপ্ন
আমাদের লড়াই
শুধুমাত্র একটি পরিচয় বহন করে চলেছে
আমরা ভারতীয় নই
এদেশ আমাদের কখনো হতে পারে না’...
এই সততা, এই সাহস আর মানুষের বিপন্নতাকে ছুঁইয়ে যাবার তাগিদ—এটাই তো একজন কবির বর্ম ও ধর্ম হওয়া উচিত। প্রতীকি প্রচ্ছদ এই বইটির অনবদ্যতা বাড়িয়েছে। কুর্নিশ, কবি উদয়ার্ণব; আপনাকে...

আলোচিত কাব্য: মৃত্যুর পর যে ঘোড়ায় চড়ে তুমি দেশ পেরোবে



কবি: উদয়ার্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক: কবিস্টেশন, মালদা
প্রচ্ছদ: বাবাই ২
মূল্য: ২৫ টাকা
যোগাযোগ: ৯৮০০৮৭৭০৯৬/৭৯০৮৭৮৯৭৭


 



সেতু বন্ধন সুব্রত সাহা

বিধিসন্মত সতর্কীকরণ - লেখাটির মতামতের দায় শুধুমাত্র এই অধমের। বই এর আলোচনার একটা নতুন রূপ বা বলতে পারেন নতুনের নতুনায়নের প্রচেষ্টা... পাঠক সহায় হবেন আশা করি। ভালো যা কিছু তা সবার জন্য তোলা রইলো। ভালো না লাগাটুকুর দায় শুধুমাত্র আমার জন্যই তোলা থাকুক। বিষন্ন বিবশ সময়ে সব্বাই  ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। সাবধানে থাকুন। ভালোবাসায় থাকুন। এবং অবশ্যই  ভালো ভাষায় থাকুন।

শূণ্য কিন্তু শূন্য নয়। শূণ্য ও প্রথম দশকের তিন লেখক ও কবির যাপনকে তাদের কাব্য গ্রন্থ ও গল্প গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় সেতু বন্ধন। আলোচনায় - "সরীসৃপ সঙ্গ", "কাচ পোকাদের প্রেম", "যারা যাপনে নেই"।

টিং টং টিং টং! - ও তোরা চলে এসেছিস? আয় আয়। মামুকে ডাক তো দিদি। - ঋষি ওই ঋষি মামু ডাকছে তোকে। তোরা কিন্তু এক্কেবারে ঠিক সময় এসেছিস। সময় এর মূল্য দেওয়া উচিৎ। ঠিক কিনা অম্বরীশ? - ঠিক ঠিক একদম ঠিক বলেছো। কিগো মামু কেমন আছো? এই নাও তোমার চকোলেট। - থ্যাংকু মামু। কেমন আছো তুমি? দিদা আর দাদু কেমন আছে? আর পুচকু ভাইটা? আরে আড়াই বছর হয়ে গেছে। বড় হয়ে গেল তো আমার মামাইটা। তা মামু তোমার পড়াশুনো কেমন চলছে? - ভালো। মামু তুমি মাকে বলে দাওতো আজকে কিন্তু আমি তোমাদের সাথে আড্ডা দেব। বাহ্, বেশ তো। তা তুমি কি কবিতা লেখ? - না পড়ি তো। মার লেখা তোমার লেখাও পড়েছি আমি। এক কাজ করি আমরা কবিতা নিয়ে আড্ডা দেব। আর তুমি ছবি আঁকবে। কি ঠিক আছে তো? - মামু দারুন আইডিয়া। তা ঠিক। পড়াশুনোটাও মন দিয়ে করবে আড্ডার পর। - অম্বরীশ বোস তোমরা। তা চা না কফি? সুব্রত কি বলে? কোনটা? - এখন কফি হোক। পরে না হয় চা হবে। বাহ্, ভালো বলেছো। - আরিব্বাস মাশরুম পকোড়া। দিদি জমে যাবে আড্ডা। আরে ওই তো দীপান্বিতাও এসে পড়েছে। আয় আয় দীপু। - যাহ্, আমার জন্য আছে তো? আছে দীপু তোমার জন্যও আছে। - চলো তবে আড্ডা শুরু করা যাক্।

 অম্বরীশ, তোমার সহেলীপনা


মাদকতা দিচ্ছে। দাদা ভাই সহেলীপনাটা কিন্তু ঠিক মাথায় ঢুকলোনা। - আরে দীপু আমি লেখার সাথে সহেলীপনার... আত্মীয়তার কথা বলছি। বুঝলে এবার। হুম, বুঝেছি। অম্বরীশ আমাদের সব্বার প্রিয় আলিপুরদুয়ার কবির শহরের অন্যতম গর্ব। - একদম ঠিক বলেছো দিদি। ও কিন্তু শুধু কবি নয় "এক পশলা বৃষ্টি" পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি এক হাজারেরও বেশী অনুষ্ঠান সন্চালনাও করেছে। আর ভীষণ ভালো সংগঠকও বটে। ভাই একদম ঠিক বলেছিস। অম্বরীশ আমাদের গর্ব। - আরে হয়েছেতো। এত কিছু হজম হবেনা কিন্তু। দাদা, তোমায় দেখে অনেক কিছু শেখার আছে। আচ্ছা, তোমার কয়েকটা গল্প শুনবো আজ। - একদম। আচ্ছা আমার দ্বিতীয় বই "সরীসৃপ সঙ্গ" থেকে কয়েকটা লেখা পড়ছি। প্রথম গল্প লাঠি, ভালো ছেলে, গলদা চিংড়ি, সোয়েটার এই কটা আপাতত পড়ছি। পড়ো পড়ো বন্ধু। তোমার পড়ার মধ্যে একটা আমেজ আছে গো। পড়ো পড়ো। - অম্বরীশ পড়া শুরু করে। একটা কথা বলতেই হয়, ১৩টি লাইনের গল্প লাঠিতে চমৎকারভাবে গ্রামজীবনের চালচিত্র উঠে এসেছে। জটেশ্বর দাসের একটা ফ্রেমে বাঁধা নিপাট ছবি পেলাম আমরা। - যতই শুনছি উথলে উঠছি। ভাষার বাঁধুনি চমৎকার। তোমার ভালো ছেলে শুনে দ্যাখো কেমন আমাদের চোখ ছলছল করে উঠেছে। - সত্যিই ভালো ছেলের সংজ্ঞা বদলে গেছে। পেছনের সারির ছেলেরাই এগিয়ে আসছে। ভালো ছেলে আর ভালো কাজের কথা অম্বরীশের কলম তুলে এনেছে। - গলদা চিংড়ি গল্পে ধরা পড়েছে সমাপন বাবুর পরিবার, মেয়ে, মিত্র বাবু, স্ত্রীর কথা ধরা পড়েছে। বাস্তব। দেখতে পাচ্ছি। ঠিক বলেছিস ভাই,  সোয়েটার গল্প জুড়ে শীতাতুরতা লেগে আছে। নস্টালজিক তেমনি পাশাপাশি দহনেরও। আবার বদল এ দুই বিপরীত চিত্রের ছবি পাই।

আচ্ছা এবার বাবলি দির কবিতা শুনবো। তোমার "কাচ পোকাদের প্রেম" থেকে কিছু কবিতা পড়ো। আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি। কি বলো? - একদম। একদম। কবিতা পড়ছি। নাম কাচ পোকাদের প্রেম। "গাঢ় সন্ধ্যার কাচ পোকারা/ গোপন প্রেম হয়ে/ আমার শরীরে বৃষ্টি নামায়।" আরেকটা পড়ছি, "ভগ্নাংশ" - "গভীর দহ জুড়ে তখন/ শারীরিক সংলাপের বসবাস;/ আর ভেঙে ফেলার বৃত্তের সমীকরণ"... সত্যি কবিতা আমাদের মনে বৃষ্টি নামায়। ভেজায়। আপন করে। - একটা ভালোলাগা কবিতা পড়ি। " নাভি পদ্ম"... "জীবনের বারমাস্যাতে উঁকি দেয় ভারাক্রান্ত উপোসী অতীত,/ নির্জলা রাত গুটিপায়ে চলা/ সরীসৃপের মতো!/ একাদশীর চাঁদ দেখে/ রঙীন স্বপ্নে ভাসে ষোড়শী মেয়ে,/ সময়ের গর্ভে টলমল করে/ নিভন্ত আলোর বদবুদ!/ জীবনের বারমাস্যাতে বয়ে যায়/ একমুঠো ছাই।" - বাবলি দি অবশ্যম্ভাবী কথাকে জীবনের ছবি তুলে ধরলে তুমি। আহা! এবার আমি একটা দিদির কবিতা পড়ে আমার ভাবনা শেয়ার করার চেষ্টা করছি। "স্বরহীন প্রতিচ্ছবি" তে তুমি স্বরহীন হয়ে কাটাতে চাও জীবন। কোনও নির্বাক কষ্ট তোমায় ছুঁতে পারেনা। হাওয়ার সাথে ডুবে গিয়ে তুমি চলে যাও অনন্ত শয্যায়... তোমার স্বরে জীবনের নির্মেদ দৃশ্যপট ধরা পড়েছে। এবার দীপান্বিতার কবিতা শোনা যাক্। - ঠিক আছে কবিতা পড়ছি। আমার বই "যারা যাপনে নেই " তে "বাবা"কে নিয়ে লেখা আছে। ওটা পড়ি। " সব মেয়েরাই মায়ের কাজল চোখ,/ আমি হবো তোমার মত ছায়া/ সামলে লক্ষী পূজার ঘট/ আমি তোমার হোম যজ্ঞ 'বাবা'।" - দীপান্বিতা উঠোন হতে চায়। বাবার মত হতে চায়। লক্ষী সোনা মেয়ে হয়ে থাকতে চূয়। বাবা তো আসলে বট বৃক্ষ। আমরা সন্তানেরা তো বাবার আঙুল ধরে হেঁটে যাই। আবার দেখ, প্রিয় শীতে কবিতায় মিঠে রোদ মরশুমি মাতোয়াল হয়। গীত রাগেরা বন্দিশে জাগে অজানার খেয়ালে। কুয়াশার দেয়ালে ছুঁয়ে থাকে সব। "মিঠে মিঠে ওম নিতে, পার্বনী পৈাষ পিঠে" রা যেমন এসেছে। তেমনি এসেছে পিকনিকের কথাও। ভালো লাগলো। - দীপুকে একটা কথা বলার ছিল। বলবো? দাদা ভাই বলো। - রাগ করবেনাতো? না না করবেনা। তুমি তো আমার ভালোর জন্যই বলছো। - ছেদ, যতি চিহ্নের ব্যাবহারে একটু মনোযোগী হও তুমি। আর বর্তমান দশকের লেখা কিন্তু পাল্টাচ্ছে। দশককে ধরতে হবে। যুগকে ধরতে হবে। ওরা কথা বলবে কবিতায়। নতুনের ডাক শুনতে হবে। ছন্দ মিলের কবিতা সবাই লিখতে পারেনা। এটা একটা মস্ত বড় গুণ। এটা আমার কেন অনেকরই নেই। কিছুটা ছন্দ মিল ছেড়ে লেখার চেষ্টা করো। তোমার লেখায় এনেকটা বিস্তৃতির জায়গা আছে। সে জায়গাটা ধরতে হবে। - দীপা, সুব্রত কিন্তু ঠিক বলেছে। আমিও কথাটা অনুভব করি।

যাক্, আমাদের আড্ডা কিন্তু জমে গেছে কি বলো সবাই? - এধরণের আড্ডা খুব দরকার। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলে লেখায় গতি আসে বলেই  আমার মনে হয়। আমি কিন্তু একমত সুব্রতর সাথে। - একটা কথা না বললেই নয়, অম্বরীশ ঘোষ আমাদের কাছে এক প্রীত নাম। গল্প লেখকদের কমতিটা কিন্তু অম্বরীশ পূরণ করবে বলেই  আমার বিশ্বাস। ওর "সরীসৃপ সঙ্গ" এক মলাটে ৫৫ টি গল্পকে ধরে তার পথ দেখাচ্ছে। আর হ্যাঁ,  শূণ্য  ও পরবর্তী দশকে লিখতে এসে আমাদের বন্ধু কবি ও সম্পাদক শুভঙ্কর পাল ও কিছু কিছু গদ্যে ও গল্পে অভাব পূরণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। - অম্বরীশের গল্প শুনি আবার। অনেক ধন্যবাদ সুব্রত ও বাবলি দি, দীপান্বিতা। পড়ছি তাহলে। - "এ্যাই খুশবু, তোর লোক এসেছে"- প্রতিদান গল্পে ভালোবেসেফেলা মেয়ের নিষিদ্ধপল্লীতে বিক্রি হয়ে যাওয়াটা সময়কে তুলে ধরছে। এটা ফ্যাক্টর  হিসেবে কাজ করছে। আবার, " উচ্চতা"য় বন্ধুর বার্গারের দাম মেটানোর মধ্যে দিয়ে সোকলড শ্রেণীর হেয় করার মানসিকতার যোগ্য জবাব খোঁচা খোঁচা দাড়ির বিমলের সরকারী আধিকারীক হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে অম্বরীশের কলম তুলে ধরেছে। - "ভাত" গল্পে বর্তমান সময়ের ফেলে আসা দিনের চিত্রপট অকপটভাবে তুলে এনেছো তুমি। সখ্যতা'য় গাছ ও আনোয়ার এক হয়ে গেছে। ভাবায় আমাদের। গাছ কাটার সাথে সাথে পাগল আনোয়ারের মৃত্যু আমাদের মানসিক বোধকে নাড়িয়ে দেয়। - অম্বরীশ দা তোমার জিন্স গল্পটা তো বোধোদয়ের আরেক ছবি। তেমনই, ইলেকট্রিক বাল্ব গল্পে জ্বলে ওঠে মহাদেব বর্মনের ঘরের দৃশ্যায়ন। অস্বস্তিতে বাল্ব নিভিয়ে লন্ঠন জ্বালিয়ে দেয় মহাদেবের বউ। আলো'র কষ্টা ফুটে তুলেছে তুমি। আর আর আর, "দেনা পাওনা" বিশ্বাস কর অম্বরীশ, পড়ছি আর কেঁদেছি। কেঁদেছি আর পড়েছি। এত অল্প পরিসরে এতটা সার্থকভাবে তুলে ধরা তোমার পক্ষেই সম্ভব অম্বরীশ। হ্যাটস অফ জানাই তোমায়। - সত্যিই অসাধারণ। নিপুণভাবে কথকতা আর ছবিগুলোকে অসাধারণভাবে ফুটওয়ে তুলেছো। শূণ্য দশকের কবিদের গদ্যে ফেরাটা কেবল সময়ের অপেক্ষা  এটুকু বলতে পারি।

এইযে গরম গরম বাটার টোস্ট, ওমলেট আর চা চলে এসেছে। - আরে মামু, কে বানালো তুই? ভেরী গুড। খিদে পেয়ে গেছে রে। নাগো মামু, শুধু চা টা আমি বানিয়েছি। টোস্ট আর ওমলেট বাবা বানিয়েছে। আসলে আমারও খুব খিদে পেয়েছিল তাই বাবাকে বললাম। আর বাবা বানিয়ে বললো নিয়ে আসতে। - হুম, দুই পেটুক একসাথে জুটেছে। যেমন মামু তেমনি তার ভাগ্নে। আরে আগে খেয়ে তো নিই। তারপর কথা হবে। আপাতত ব্রেক নেওয়া যাক্ একটু। কি বলো সবাই? - ব্রেক হোক। টোস্টগুলো খুব মুচমুচে হয়েছে। আর ওমলেটটাও টেস্টি। আর চা টা অসাধারণ হয়েছে। - কে বানিয়েছে দেখতে হবেতো... খাওয়াদাওয়া  তো হলো। আড্ডায় ফেরা যাক্। - একদম। যে কথা হচ্ছিল। ফিরি। আচ্ছা আমরা তো সবাই কবিতা, গল্প পড়ছি সুব্রতর কবিতার কথা কি ভুলে গেলাম সবাই।  সুব্রত  কবিতা শোনাও। - সে শোনাব নিশ্চয়ই।  সবার শেষে। এখন অম্বরীশের গল্প নিয়ে বাকী কথাটুকু হোক। যেটা বলছিলাম, "কর্তব্য"এ এক জটিল অবস্থান। দুটো মেয়েকে নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ও নীল হয়ে আকাশে মিশে যাওয়া... আবার " গাছ" এর কথা লিখেছে গল্পকার অম্বরীশ অনায়াস দক্ষতায়। বাবা তো প্রতিটি মানুষের জীবনে গাছের মতোই। বলতে পারি জীবন গাছ। তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। আর "নীতিকথা" য় ছোট্ট মেয়ের কাছে বাবার শেখাটা ধরা পড়েছে। যা আমাদের অন্যরকম ভালোলাগায় ভরিয়ে তোলে। আমরা তন্ময় হয়ে পড়ি... রেশ থেকে যায়...

- বাবলি দি, এবার পড় তুমি। "অনাচার"- স্বরবর্ণের পথে হেঁটে গিয়ে/ লিখেই ফেললাম বিন্যস্ত ব্যাকরণ,/ আর খুব গোপন অনাচারের আখ্যান!/ যা আড়াল করেছিলাম নিতান্তই / তোমার চোখের কথা ভেবে,/ যে চোখের দহনে দাহ হয়/ একটা নদী আর ক্ষতবিক্ষত অনাচার"। - বেশ ভালো লাগলো দিদি। " স্ব-অন্বেষণ" এ তুমি অবয়বহীন ডাইমেনশনে লজ্জাকে ফ্রেমবন্দী করে রাখো তুমি। আবার প্রত্যাশিত ভুল চাহনি’র অবসান ঘটিয়ে টিস্যু পেপারে মুছে দাও বিষাদ। অবধারিত যন্ত্রণা, অবগাহনে ডুবে যাওয়ার মধ্যে বেআব্রু জীবনের স্ব-অন্বেষণ ঘটাও তুমি। - ঠিক তেমনি করে তোমার কলমে তুলে এনেছো - "শস্যদেবতা"য় সময়ের পালা বদল, স্বপ্নেদের নেমে আসা গোপন টানেল বেয়ে। শস্যদেবতার বীজ বপনে ও সশব্দ রাত জেগে থাকে"। একটা কথা বলতেই হবে, " তন্দ্রা, স্বপ্ন এবং মুখোশ" কবিতা আগে লেখা হলেও বর্তমানের সময়কে তুলে ধরলো অনেকটাই। "ফসিলের মতো সম্পৃক্ত মুহুর্তোগুলো/ অপ্রকাশ বিষাদ মেখে হেঁটে যাই/ শূণ্যতার দিকে।/ এতসব তন্দ্রা, স্বপ্ন অথবা আত্ম নিষেকের উর্বরতা যাপন করি/ স্বজনহীন যান্ত্রিক খেয়ালে।/ মোমের মত রাত গলে যায় দুর্বোধ্য আগুনে।/ আর সাদা মেঘ নেমে আসে/ আমাদের সাজঘরে/ এবং অবিরত চলতেই থাকে/ মুখোশের কার্নিভাল।" - নিজের শহর নিয়ে বাবলি দি শোকাতুর। এভাবেই তার চিহ্ন "অন্তর্জলি যাত্রা" য় দেখতে পাই আমরা। "যেদিন শহর ডুবল জলে/ একবুক আগুন নিভিয়ে এলে/... যেদিন/ শহর পুড়ল বারুদে.../ দুচোখ ভরা বৃষ্টি  নিয়ে এলে/ সে বৃষ্টিতে/ আকাশও ভিজে গিয়ে/ তোমাতেই বানভাসি হল"- এভাবেই  বলে ওঠো তুমি। আর আমরা দেখে নিই একটুরো ছবি।







দীপান্বিতার "বাঁধনে" পিছুটান, ক্ষয় কিসে রাখবে সেই প্রশ্ন করেছে। তেমনি রোজকার অভিযোগ ও অভিমানেরা মাখামাখি হয়ে গেছে। অনেক কিছু সরালেও বড়াই এর তীর বুকের ভেতর বিঁধছে। হারানোর সুর বিষন্ন সানাইয়ে বেজে ওঠে। মায়ার বাঁধনে জড়ায়। খুব সামান্য অক্ষরের জাদুতে ছবি আঁকা হয়ে গেছে। - "পশমিনা চাঁদ" কবিতায় "ভিনদেশী এক পশমিনা চাঁদ জলোচ্ছাসের পর জেগে উঠেছে। কাজল চোখের কোণে জমিয়েছে কোন গোপন আতাত। মেঘের সাথে আড়ি যেন বাড়িয়ে রেখেছে তফাৎ।  শেষ লাইন চমৎকার। " খুব গোপনে ভিজলো এ মন.../ ছুইতে চেয়ে ব্যর্থ বিফল/ জোস্নার ক্ষত।" "নিয়ে যাবি" তে দীপান্বিতার খুব ইচ্ছে করে পাশাপাশি হাত ধরে সুমুদ্দুরে যেতে। কবি হারিয়ে যেতে চায় অচিনপুরে। বলে ওঠে, "নিয়ে যাবি?/ আমার তো খুব ইচ্ছে করে,/ সঙ্গে তোর রাত্রি দিনের সাতকাহনে।" গহন থাকার ইচ্ছেগুলোই নদী হয়ে বয়ে যায় ভেতর বাইরের খরস্রোতে। তারপর ইতিবৃত্ত লেখা হয় শেষ পেরেকে। - পুরোনো ও নতুনের মিশেলে কবির যাপন ধরা পড়ে এভাবে, "অথচ এই ঘনীভূত রূপকথায়,/ আহ্নিক ঘিরে বৈরাগী বনবাস।/ পদ্যে লেখা সে ডুবে যাওয়া নদী,/ যাপনে রাখা উলম্ব অবসাদ।" এভাবেই কবিতার কাছাকাছি চলে আসে পাঠক।

আবার কবি বাবলি সূত্রধর সাহার কলম বলে ওঠে, "অযুত বছর চলে যায় প্রত্যাশিত/ ডার্ক রুমে"। " অযুত" শব্দের প্রয়োগে কবি তুমি এনে দিলে এক বহুমাত্রিক রূপটান। বাবলি দির বইটিও মুদ্রণ প্রমাদে পড়েছে। অম্বরীশের বইতে থাকলেও তুলনামূলক তা কম। এই  ত্রুটিটুকু বাদ দিলে কবি ও গল্পকারের যাপনের স্বাক্ষর বহন করছে আমাদের আজকের আলোচ্য বইগুলো। বাবলি দি'র মায়াজড়ানো কবিতা "পয়লা জুলাই" পড়ছি। একমাত্র বোনকে হারানোর যন্ত্রণাবোধের সঙ্গী হই আসুন পাঠক। "পয়লা জুলাই ফিরলাম শহরে,/ সেই যে নদী উৎসব, নুড়ি পাথরের/ ফেলে আসা জল রং আর/ তোমার ল্যাভেন্ডারের শিশি,/ সবই গোছানো ছিল;/ অথচ গতকালই চলে গেলে তুমি.../ ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেল শুধু ইনজেকশনের চ্যানেল!/ আর বেঁচে থাকার মিথ, জন্মান্তরের সনেট।/ এবং কিছু ব্যথার হাইফেন।/ সবটাই গুছিয়ে রাখি বিষন্নতার নোনাজলে!" - এর পর আর কথা থাকতে নেই।

……………………………………………………………………………………………………….





১. আলোচ্য গল্পের বই- সরীসৃপ সঙ্গ, লেখক- অম্বরীশ ঘোষ প্রকাশক - দি সী বুক এজেন্সী, কলকাতা প্রথম প্রকাশ - মহালয়া ১৪২৬, সেপ্টেম্বর ২০১৯ মূল্য- ১২০/- টাকা


২. আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ - "কাচ পোকাদের প্রেম"। কবি- বাবলি সূত্রধর সাহা প্রকাশক- দৃশ্যমুখ প্রকাশন,

প্রচ্ছদ- উত্তম চৌধুরী, 

প্রকাশকাল- জানুয়ারী ২০২০

মূল্য- ৩০/- টাকা




৩. আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ- "যারা যাপনে নেই" কবি- দীপান্বিতা রায় সরকার প্রকাশক- মামমাম বুকস্, কলকাতা প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারী  ২০১৯, মূল্য- ১৫০/- টাকা ……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

সুব্রত সাহা, চা বাগান ঘেরা ছোট্ট জনপদ শামুকতলা, আলিপুরদুয়ার জেলায় থাকেন। ৭ই জুলাই ১৯৮১তে জন্ম। বাংলার পাশাপাশি সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর। শিক্ষকতার সাথে যুক্ত। "ক্রিয়েটিভ আইডিয়াস ফোরাম" এর কর্ণধার। ভালোবাসাবাসি কবিতা, গদ্য লেখা ও সমাজ সচেতনতায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আড্ডা। লিখেছেন সচেতনতামূলক কয়েকটি ছোট্ট নাটক। করেছেন কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনাও। সবুজের চিঠি, অথবা এবং নীল পাখি সম্পাদনা ও প্রকাশনাতে যুক্ত ছিলো। কবিতা লেখার শুরু শূন্য দশকে, দু'হাজার সালে। একমাত্র কবিতার বই - "যে গানে বৃষ্টি নামে"। "এখন বাংলা কবিতার কাগজ" জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত হয় ২o১১ এর কলকাতা বইমেলায়।

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………




 


‘মদীয় ফ্যান্টাসি’: তিলেক ডিকোডিং - মহঃ রাফিউল আলম

 

রাহেবুলদার মদীয় ফ্যান্টাসি’ পড়তে পড়তে কোথায় যেন একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবার ফ্যান্টাসি চলে এল। যদিও এত উচ্চমানের লেখায় পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবার সাহস বা সামর্থ্য কোনোটাই নেই এই অধম পাঠকের। তবু দুস্পর্ধা দেখাবার সাহস করেই ফেললাম। আমি খুব সামান্য একজন পাঠক। পাঠক বললে অবশ্য ভুল হবে নিজেকে কবিতাবিলাসি বলা ভালো। সবার লেখা ভালো লাগেনাসবার লেখা— সবসময় পড়ে ওঠার সময় হয়ে ওঠে না বলেই হয়তো অনেক মুক্তসম লেখা আমার পরিধির বাইরে থেকে যায়। আগেই বলেছি আমি নিয়মিত পাঠক নই। কিন্তু ফেসবুক সূত্রে রাহেবুলদার লেখাগুলো চোখে পড়লেই না পড়ে থাকতে পারিনা। লেখাগুলো আমা প্রচণ্ডভাবে টানে। রাহেবুলদার শব্দ কিংবা কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলা সাহিত্যের বাঁক যে পরিবর্তন হচ্ছে তার পূর্বাভাস। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে শব্দগুলো ভাঙতে ভাঙতে হারিয়ে যেতে হয় কবিতার মধ্যে। তবু দুর্ভেদ্য। রাহেবুলদার কবিতা ভেদ করে ওঠার সামর্থ্য আমার মতো সাধারণ পাঠকের সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে লেখার মধ্যে আছে এমন এক মাদকতা যা সহজেই একজন পাঠককে গ্রাস করে। আর পাঁচজন কবিতার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলার পথটাও তাই হয়তো আলাদা। আমি যত দূর তাকে বুঝেছি সেখানে কোনো কবিতা গোষ্ঠীতন্ত্র নেই, নেই কোনো মিথ্যে আত্মবঞ্চনা। এখানেই কবি স্বতন্ত্র। উত্তর আকাশে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা সেই নক্ষত্র যাকে অস্বীকার করার জায়গা নেই। আমার বিশ্বাস একদিন এই নক্ষত্রও একটা আলাদা নাম পাবে। কবি কবিতার জন্য কবিতা লেখেন না। যা লেখেন তাই কবিতা হয়ে ওঠে। ভাষার মধ্যে মেক আপ কম। কবিতা অক্ষরে দরদের থেকে সত্যতা অনেক বেশি। তবে অবশ্যই সাংকেতিকতা। অনেকটা চর্যাপদের মতোই আলো-আঁধারি বলেই হয়তো পাঠকের কাছে পুরোটা ধরা হয়ে ওঠে না। অনেকটাই অধরা থেকে যায়।

 

তার মদীয় ফ্যান্টাসির প্রথম কবিতা মরাভরাচান্দ্‌’ কবিতার প্রথম লাইন

"কথা ছিল ভাঙার। কীরূপ কথাকাহার লগেতাহা ছিল অনুল্লেখ"

পড়েই বোঝা যায় কবির কলম থামবার নয়। যেমন ভাষাতেমন শৈলীও স্বতন্ত্র। এখানেই কবিকে আলাদাভাবে হাজার ভিড়ের মাঝেও চিনিয়ে দেয়। বইটা হাতে নিয়ে একঝলক কবিতার নামগুলো দেখলেই বুঝতে পারা যায় কবির মতোই স্বতন্ত্র তার কবিতার নামগুলো—'রিভিজিটেড: পানি, ‘অথবা কচুকাটা রাই, ‘N কোড, ‘বগা ও শর্টসার্কিট, ‘বাউলা, ‘হে, ‘পানিপট্টি, ‘লুকোছুপো লিওনি, ‘গুঁড়ো কবিতা’, ‘ডটে কম প্রভৃতি। বিষয়-আঙ্গিকও একক। বোঝাই যায় কলম যথেষ্ট শক্তিশালী। এ যেন কবিগুরুর অচলায়তন এর পঞ্চক বা শুভদ্র।

 

তার কবিতায় এসেছে যেমন আত্মবিশ্লেষণ, আবার বর্তমান অস্থিরতা সব মিলিয়ে একটা যুগযন্ত্রণা। তাই তিনিই বলতে পারেন "একটা ঘুমের কিন্তু ব্যাপক চাহিদা দ্যাশ জুড়িয়া" (রিভিজেটেড: পানি)আবার অথবা কচুকাটা রাই-এ "ভেন্টিলেটরে পুঁজ সংরক্ষণ হতে হতেই পুঁজিপতি আমি।"

তার এই কাব্যের শেষ কবিতা কুহেলি-র একটা লাইন "ফুটেজ খায় কানের দেয়াল...." সম্পর্কে আর কিছুই বলার থাকে না। অন্যদিকে ঈশ্বর-অস্তিত্ব নিয়ে তিনি বরাবরই সন্দিহান "মানুষ নির্মিত সর্ব উৎকৃষ্ট মিথ: ঈশ্বর" (ঈশ্বরের পাঠ)। কখনো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন পাঠকের কাছে কাহার লগেতা অবশ্য অনুল্লেখ—"ঘাস কাটতে ব্যস্ত ঘোড়া কী মনে করে তোমার গুঁড়ো ঘুমে?"(গুঁড়ো কবিতা)কখনো অল্পতেই খুশি থাকার প্রয়াস "মাইরি এতটুকুন লয়েই আমি তবু খুশ।" ভালো লেগেছে তাঁর আখা কবিতায়

"কতগুলি মরমিয়া আগুন পুড়ছিল একা একা।

দুই বেড়াল আর আমিতে মিলে আখার পাড়ে বসে।"

অবশ্য কতটুকু পোড়ার পর নিজেকে বিদগ্ধ বলা যায় আমি জানিনা।

তার পানিপট্টি কবিতায় "আম্মা আব্বা আমার পাশে শুয়ে— আমার কবরের পাশে শোবে তেমন?" সত্যিই অসাধারণ! যদিও তিনি বলেন "এ আবদার আদায় করেনিএ মতন ভাবছুলুম।"

 

আবার বর্তমান অস্থিরতা ধরা পড়েছে তার কবিতায় খুব সুন্দরভাবে "কেউ কোনোদিন হোঁচট খায় না দড়িতে যা সে প্রত্যহ খায় সাধের জনতন্ত্রের সদর দরজায়"(গোরুগোঁসাইজি)। "আগুন পুড়ছে" সত্যিই আগুন পুড়ছে। "সাদাসুন্দর কোয়ি আগুন" (সম্বাদ)।

"ইঁদুর দৌড় দিতে দিতে ইঁদুরকে ভুলে যায় কি একদিন?"(‘পার্থিব) জানা নেই। হয়তো বা যায়। "কোনোদিন স্টাডি করে দেখ মাংসাশী পিঁপড়ে..../বা মাংসাশী মানুষ....." (বাউলা)। "তোমার কর্পোরেট করমর্দন আজ আমায় বাউলা বানায়...." (বাউলা) এরপর আর কী বলার থাকেএক কথায় সত্যিই মদীয় ফ্যান্টাসি

 

খারাপ লাগার কোনো জায়গা নেই। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ এই মদীয় ফ্যান্টাসি। আর প্রথম কাব্যগ্রন্থই প্রথম বলে বাউন্ডারি। তবে সেটা চার না ছয় আগামী সময়ই বলবে। এ তো শুধু ভালোলাগার কথাই বললাম।

এবার আসি কিছু মন্দলাগার কথায়, ভাষা-বিষয় অনেক বেশি গভীরউচ্চমানের কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় সাধারণ পাঠক কতটা নিতে পারবে! যদিও কবি কখন পাঠকের কথা ভেবে লেখেন না। লেখেন নিজের কথা ভেবে। আর পাঠকের কথা ভেবে লিখলে সেটা আর কবিতা হয়ে ওঠে না। অনেকটা তোষণ হয়ে যায়। এটা আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু তবু পাঠক বলে কিছুর অস্তিত্ব থেকেই যায়। যাকে অস্বীকার করার সাধ্য আমাদের কারোর নেই। কবিতার বিষয় ছুঁতে হয় অনেক কষ্ট করে, তাই আমার মতো একজন সাধারণ পাঠকের কাছে কবিতাগুলো কিছুটা আলো-আঁধারি মনে হয়। সবশেষে এটাই বলব কবির প্রত্যেকটা কবিতার মশাল-অক্ষর একদিন আলোকিত করবে এই বাংলা সাহিত্যকে। আর আশা রাখবো এভাবেই কবি এগিয়ে যাবেন আপন খেয়ালে এক ভিন্ন পথের দিশারী হয়ে। জানি সিসিফাস (কবির ছদ্মনাম) একদিন সেই পাথরটা উপরে তুলবেই। আর সেদিন হয়তো বেশি দেরি নেই। কবির সাফল্য কামনা করি।

আর সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অনুরাগীদের জানাই কবির মদীয় ফ্যান্টাসি হাতে তুলে নিয়ে দেখুন। নতুন স্বাদের সদ্য আবিষ্কৃত খনি। ভালোবেসে পড়ুন। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

 

 

আলোচিত বই- মদীয় ফ্যান্টাসি

প্রকাশক- সৃষ্টিসুখ, কলকাতা

যোগাযোগ- 9051200437

 

****



 

আলোচকের পরিচিতি:

প্রথম দশক থেকে মূলত ফেসবুকেই টুকটাক কবিতা, গল্প লেখা। এখনও অব্দি কোনও বই নেই। কিছু গল্প প্রকাশিত হয় মানভূম দৈনিক সংবাদপত্রে’। একটি উপন্যাস রচনার কাজ চলছে।

 

যোগাযোগ:

মহঃ রাফিউল আলম

গ্রাম- খড়িকাডাঙ্গাডাকঘর- পাঁচগ্রামথানা- নবগ্রামজেলা- মুর্শিদাবাদডাকসূচক সংখ্যা- ৭৪২১৮৪

মোবাইল- 9732302307

 

 

Sunday, July 26, 2020

বুক রিভিউ :
এক নদী অভিমান / তন্ময় রায় 



যে উচ্চারণগুলো জীবনের কান ঘেঁসে বেরিয়ে যায় না, তার আশেপাশে বাস করে, যে উচ্চারণগুলো আমি বা আপনি করতে চাই কিন্তু পারি না, আসুন এই ‘স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবন’-এ ঘাড় ঘুরিয়ে তাদের সঙ্গ নেওয়া যাক। প্রবীর চন্দ্র দাস-এর লেখা এই e-book-এর প্রতিটি কবিতাই শিরোনামহীন, পড়তে পড়তে মনে হয় আসলে একটিই কবিতা পড়ছি, সেই দিক থেকে দেখলে, এটি শুধুমাত্র ‘কবিতা সংকলন’-এর ধারণা টপকে কাব্যগ্রন্থের দিকে যাত্রা করেছে।

পৃষ্ঠা অনুযায়ী বিন্যাসে, কবিতা, পৃষ্ঠার বামদিকে, মাঝখানে এবং ডানদিকে অবস্থান করছে। যেন অনেকটা পাঠকের সাথে কবির, কবিতা আদানপ্রদান চলছে, কখনো পাঠকের কোর্টে বল কখনো নিজের কাছে রেখে খেলিয়ে নেওয়া আবার কখনো  সেই বল জীবনকে উৎসর্গ ক’রে এগিয়ে যাওয়া। বাম, ডান বা মাঝখান যে দিক দিয়েই যাওয়া হোক না কেন জীবনের উত্তাপ কবির প্রতিটি উচ্চারণকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। উৎসর্গপত্র থেকেই এর আঁচ পাওয়া যায়-
“যার ঘামে ভেজা পিঠটা আমার কাছে হিমালয়ের প্রথম সিঁড়ি এবং বন্ধু রাজীব”

সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক চেতনা সঞ্জাত কবিতার যাত্রাপথে, আয়নায় নিজেকে উলঙ্গ করতে পারা এবং ঢিল মেরে সেই আয়নাকে টুকরো ক’রে, তাতে নিজের প্রতিটি বিম্বের ভিন্নতার তল্লাশি পাঠক হিসেবে আমাকে রসদ দেয়। সস্তার জীবনগুলোর হাজারো দ্বন্দ্ব কবির কলমে দিব্যতা পায়। আপনাকে ত্রিকালদর্শী বানিয়ে পরক্ষণেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া -
“আচ্ছা পুরুষ কখনো বাবা হতে পারে!
নাকি সব বাবারা পুরুষের মতো দেখতে
ধরুন আপনি ত্রিকালদর্শী নন,
আপনাকে না জানিয়ে
লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে
এবার বলুন তো আপনি পুরুষ না বাবা।”

অক্ষর দিয়ে শব্দ বানিয়ে গড়ে তোলা গল্প নয়, “প্রতিটি অক্ষর আসলে এক একটা কাহিনী”। সেই কাহিনীর কিছু প্রসাদ-
“ভেতরে আগুন থাকলেই
অস্তিত্বের খাবার তৈরি করা যায় না”
বা
“নিজের শরীরের পোড়া গন্ধে
কতগুলো সংগঠিত মুখ নাকে রুমাল চেপে বিশ্লেষণ করবেন
এ আগুন গুহামানবের...”
বা
“হ্যাঁ আপনি ঠিকই ভাবছেন
আর পাঁচজন যেভাবে ফ্রিজের ঠাণ্ডা রুটি
হাত পুড়ে সেঁকে নেয়
আপনাকেও কয়লার ধোঁয়া পেরিয়ে সেঁকে নিতে হবে জীবন।”
‘আপনি’-কে আর পাঁচজন থেকে আলাদা ক’রে, জীবন সেঁকার মামলায় আবার সেই ‘আর পাঁচজন’-এ মিশিয়ে দেওয়াতে কবির মুচকি হাসি টের পাই।
“আপনি নিজের জন্য কিছুই করতে পারলেন না
যাবার সময় ভোটার তালিকায়
নামের বানান ভুল করে চলে গেলেন”
এই ‘আপনি’-র পরিচয়-মাহাত্ম্য-টাই ক্ষীর!

রোজকার জীবন থেকে কবি আয়ু রোজগার করেন, আয়ুতে প্যাঁচানো আগুন লুকোতে ব্যবহার করেন পাঁজর! আমার পাঠের পাঁজর লক্ষ্য করে কবির বল থুড়ি পঙক্তি ধেয়ে আসে -
“কতগুলো ছাপোষা যকৃৎ সহজ গণিত চাইছে” !!
আমার এতক্ষণ পাঠে তৈরি হওয়া ধারণা চুরমার হয়। নতুন দরজা খুলতে শুরু করে।
“আমি কুড়িয়ে পাওয়া একটি বুদ্ধিমান খুঁজছি”
বা
“নিজেকে প্রমাণ করতে গেলে
একটা আয়তক্ষেত্র যথেষ্ট নয়”
বা
“লোকটা শেষ অবধি মাটি খুঁড়ে পুঁতে রেখেছিল গল্পের পাহাড়”
খোঁজের প্রচেষ্টার সাথে অস্থিরতা দ্বারা সংক্রামিত হই। রসদের হৈ চৈ দ্বিতীয় প্রহরেও জেগে থাকে।
“একটা রাত হজম করতে গেলে
যতটুকু প্রয়োজন চিবিয়ে খেও”
এসবের মাঝে আমিও ভেতরে কোথাও রাতের আনাগোনা টের পাই, টের পাই গভীরতার মেঘে “বৃষ্টি হবে হবে এমন সময় / জারি হল ১৪৪ ধারা”। না, রাজনীতি নয় এবারও কবিকে চুমু খেয়ে গেল জীবন আর মাথা উঁচু করে জীবন বাঁচার চেষ্টা।
গল্পটা স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবন নিয়ে নাকি শুকিয়ে যাওয়া বুকের দুধ নিয়ে নাকি তাদের নিয়ে যারা ‘জ্যোৎস্নার মতো ঝকঝকে রাষ্ট্র’-এর কথা ভাবেন, তার খুলাসা করতে গিয়ে আমি মুখোমুখি হই সেই ব্যক্তিটির যে জেনে গেছে “কারোর কাছেই জটিল করে কিছু চাইতে নেই” আর যার জীবনের প্রতি আবেদন-
“তোমাকে সহ্য করে যে শব্দ
খালি মুখে বসে আছে
তুমি তার কাছে ফিরে এসো জীবন”।

আর মাত্র কয়েকটি কথা, কারণ কবি বলেছেন, “কথা দীর্ঘ হলে শব্দের কঙ্কাল বেরিয়ে আসে”; এই রকম প্রচুর উদ্ধৃতি দেওয়ার মতো লাইন এই বইতে আছে। স্বাভাবিক ছন্দেই তারা আসুক এটাই কাম্য; তবে তাদের কেউ কেউ ক্ষেত্রবিশেষে আরোপিত মনে হল। দর্শনের সাথে কবিতার বিরোধ কিছু নেই, কিন্তু কবি যদি কিঞ্চিৎ সচেতন হন, তাহলে লেখা আরও নির্ভার হয় এই আর কি…
প্রচ্ছদ নিয়ে আর একটু ভাবনাচিন্তা করা যেতে পারত। 


স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবন - প্রবীর চন্দ্র দাস
মিস্টার বুক পাব্লিকেশন ( mrbook.in)
মূল্য- ৩০ টাকা। 

Saturday, July 25, 2020

সূর্যাস্তের খাতাঃ আলো-অন্ধকারের এক জটিল সমীকরণ...

শৌভিক বণিক


দুই মলাটে ৩০টি আখ্যান নিয়ে আলোও আধারের খেলার ভেতর হাই তুলছে সূর্যাস্তের খাতা।মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

একজন কবির জীবনের শ্রেষ্ট অর্জন সম্ভবত তার নিজস্ব এক কাব্য ভাষা নির্মান।
সেই চিহ্নিতকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কবিতার ছত্রেছত্রে। তার কবিতা স্বতন্ত্র ও নিজস্বতায় স্বকীয়।কবিতা তো সত্যেরই আধার। তার মেধাবী উচ্চারণ,ভাঙা গড়ার ভাষ্য, রূপক ও অলংকারের ভেতর ফুটে ওঠা আবক্ষ যেন পৌছে যায় এক অনন্য জীবনবোধে।

কবি যখন বলেন 

শরীরের বিন্দু বিন্দু ঘামে         
অন্তিম সঙ্গম চেয়েছো                তাই স্নান ঘরে নতুন সুগন্ধি     
বিগত হয়েছে রোদের নাম         
নীল খাম বদলে নিয়েছে রং
আজও চোখে জল ভরাট হয়           প্রতীক্ষার উঠোন জুড়ে         
ভাঙার খেলায়...

নস্টালজিক প্রেমের সংজ্ঞা ভাঙতে ভাঙতে কবি দৃশ্যপট বদলে ঢুকে পড়ছেন নির্মম এক সত্যের কাছে। আলোর উল্টো দিকে নির্মোহ অন্ধকারে।

সম্পর্কের তাপ উত্তাপের আলংকারিকদিকটিও পাঠকদের কাছে অনাবৃত হতে থাকে...
আলোআধারির এই চিরায়ত খেলায়
সম্পর্কের নাম হয়ে ওঠে "জটিল সমীকরণ অথবা হেয়ালি"

আবার কবি লিখেন
অন্ধ গোলাপ নগ্নতার মানচিত্রে বিপণী

বিজ্ঞাপন সর্বস্ব এই বাজার সভ্যতা নারীকে আজ পন্যে পরিনত করে তুলেছে।  তাই গোলাপ অন্ধ হলেও নগ্নতার প্রশ্নে তার বাজারদর নির্ধারিত হচ্ছে। তার কবিতায় দেখতে পাই পরাবাস্তবতা


ডট পেনের শিষে ভরা রক্ত

ভেজা পৃষ্ঠা থেকে উড়ে আসে ওড়না

পান্ডু লেখ্য হয়ে ফুটে উঠছে এক ম্যাজিক আলো
প্রভৃতি এমন লাইন জেগে উঠছে তার কবিতার ছত্রেছত্রে। 

কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে যেতে হয়। মীনাক্ষীর কবিতা আপাতভাবে দুরূহ, জটিল মনে হলেও ঠিক তা বোধহয় নয়। সময়ের জটিল আবর্ত থেকে উঠে আসা বোধ আসলে সময়ের উপহার। 

কয়েক দশক আগে আর্থার মিলার বলেছিলেন, ‘ভাষাকে যে আক্রমণ করে সেই ভাষাকে বাঁচায়।’

তার কবিতার আঙ্গিক জুড়ে বিষাদময়তা আর অপ্রাপ্তির ঢেকুর তুলছে কথামালা।
যুগযুগান্ত ধরে সাহিত্যে বিষাদ, যন্ত্রণা, দুঃখ, ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে এতো নতুন কিছু নয়। নতুনত্ব এখানেই ইতিহাসের কোন চরিত্রই হোক বা বিঞ্জানে কোন নিগুঢ় তথ্যই হোক বিষাদকে খন্ড বিখন্ড করে নিয়ে যাচ্ছে এক একটি আখ্যানের সম্পূর্ণতার দিকে। তরুন কবি স্পর্ধাতে কবি শঙ্খ ঘোষও বলেছেন "যথার্থ উত্তরসূরি যিনি, তার তো চাই বৃত্তভাঙার ঝোঁক।"
বাংলা কবিতার গতানুগতিক বৃত্তের বাইরে গিয়ে এই কবিও সর্তকতায় সেই বৃত্ত ভাঙছেন তার কবিতার পঙক্তিতে   পঙক্তিতে।

মীনাক্ষী কবিতা আসলে আলো-অন্ধকারের এক জটিল সমীকরণ। পাঠককে নিয়ে যায় এক অগ্রন্থিত অন্ধকারের দিকে। যেখানে পাশ ফিরলেই পাঠক দেখতে পায় এমন এক সত্যের, যার সামনে-পিছনে দু'দিকেইই রয়েছে অন্ধকার। এই অন্ধকার ক্রমশ আলোর দিকে মুখ তুলছে খুঁজছে উত্তরণের পথ। 
কবি বোধহয় সর্তকভাবেই ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে এভাবেই এগিয়ে চলছেন। 


সূর্যাস্তের খাতা
কবি মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ - কৌশিক বিশ্বাস
প্রকাশক- অশোকগাথা
দাম ৬০,