Showing posts with label ব্যক্তিগত গদ্য. Show all posts
Showing posts with label ব্যক্তিগত গদ্য. Show all posts

Saturday, February 24, 2024

 

শৈশবের ভোজপুরি গানে নোংরামির আনন্দ  

মলয় রায়চৌধুরী


যাঁরা আমার স্মৃতিকথা ‘ছোটোলোকের ছোটোবেলা’ ( চর্চাপদ ) আর ‘ছোটোলোকের জীবন’ (প্রতিভাস) পড়েছেন, তাঁরা আমার শৈশবের ইমলিতলা পাড়ার সঙ্গে পরিচিত । ইমলিতলা ছিল পাটনা শহরের গরিব অন্ত্যজদের, যাদের এখন মহাদলিত বলা হয়, তাদের বস্তি ।   আমার চরিত্রগঠনে বা বিগঠনে খাঁটি অবদান  ইমলিতলার মানুষগুলো  ; সেখানকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষিত করে তুলেছে, শিখিয়েছে মানসিক-ঔদার্য, সারগ্রাহীতা, তার প্রতিটি বাসিন্দা ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বেপরোয়া, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী, যারা নিজেদের বলতো “দুনিয়াকা নাসুর”, মানে পৃথিবীর এমন নালি-ঘা, যা সারে না । প্রথমে বিদেশি ও পরে স্বদেশি সরকার তাদের জীবনযাত্রার লড়াইকে মনে করেছে প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, মনে করেছে মৌরসি-পাট্টার শত্রু, তাদের মনে করেছে বিপজ্জনক, অথচ তা ছিল ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা । জীবনকেচ্ছা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতো ইমলিতলা পাড়ায় কিন্তু সেসব নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের মতন কেউই খিক-খিকে হাসি হাসতো না, মাথা ঘামাতো না । 


যে কোনো উৎসবে ভোজপুরি বা পাটনাই গান গাইতো পাড়ার বউ-ঝি-মরদরা মিলে, ঢাক-ঢোলোক পিটে, যেমন এই গানটা :

যৌবন হোই ফিউজ জে করবে তু ইউজ

হই চঢ়ল তোর জওয়ানি ছোড়তা কোই পানি

এ রানি

যৌবন হোই ফিউজ জে করবে তু ইউজ

হই চঢ়ল তোর জওয়ানি ছোড়তা কোই পানি


ইমলিতলা পাড়ায় কবিতা নামে কোনো ব্যাপার ছিল না । ছিল ভোজপুরি বা পাটনাই গান, যাকে কেবল পাড়ার লোকেরা নয়, আমাদের বাড়িতেও অশোভন বা অশ্লীল মনে করা হতো না । আমার মা ওই পাড়ার বুলি রপ্ত করে ফেলেছিলেন, যা, উনি পরে জানতে পারেন, সংস্কৃতিবান হিন্দিভাষীদের কাছে অশোভন, এমনকী অশ্লীল । ইমলিতলার বস্তিবাসীদের জমায়েতে ইঁদুর পুড়িয়ে খাওয়া হতো, শুয়োরের মাংস খাওয়া হতো ; শৈশবে আমি পুরো ইঁদুর-পোড়া  খাইনি, বমি করে ফেলব আঁচ করে, তবু একটুকরো মুখে দিয়ে চেখেছিলুম, বিটকেল সোঁদা গন্ধ ; তবে শুয়োরের মাংস যখনই পাড়ায় রাঁধা হতো, খেয়েছি । দাদা সমীর রায়চৌধুরী ইঁদুর-পোড়া খেয়েছিল, তাড়ি দিয়ে । আমার তাড়ি আর ঠররা খাবার ট্রেনিঙ তো ইমলিতলায় । তাড়ি খেয়ে এরকম গান গাওয়া হয় :


তোহরা ইসক মেঁ পাগল

ভইল কাচি কাওয়ারি

ভইনি হম জয়সে

গরমি কে শাম সজনা

হাঁ বে তু লওঙ ম্যাঁয় ইলাইচি

হাঁ বে তু লওঙ ম্যাঁয় লাআআচি

তেরে পিছে আ গওয়াচি

তু লওঙ ম্যাঁয় ইলাইচি

অনেকের মতে, গত এক দশক ধরে ভোজপুরি ভাষায় লেখা গানের মিউজিক ভিডিওতে এমন ধরনের দৃশ্য দেখানো শুরু হয়েছে যাকে অনেকেই সফট পর্ন বলেন । অন্য পাড়ায় যে বাঙালিরা থাকতেন তাঁরা ভোজপুরি বা পাটনাই গানগুলোকে মনে করতেন নোংরা ।   আমি আমার সহ্যশক্তি আর যুঝে যাবার ক্ষমতা ইমলিতলার বস্তি থেকেই পেয়েছি : হাতকড়া, কোমরে দড়ি, জেলহাজত, শত্রুদল, কুখ্যাতি, অপমান, অপপ্রচার, বিরোধিতা, কটূ মন্তব্য, বিশ্বাসঘাতকতা । সেই পাড়ার গান শুনলে টের পাওয়া যায় যে অমন বস্তিতে জীবনের শুরুটা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্যে ঢোকাকে বলা যায় জীবনের টেকটনিক প্লেটে শিফট ।

কেমন গান ? যা শুনলে মগজের সহ্যশক্তি বাড়ে ? এরকম :

দায়ে অওর বায়ে কে হিলে ত লাগে বেটর

দায়ে অওর বায়ে কে হিলে ত লাগে বেটর

হই তোত দুনু ইনডিকেটর

হই তোত দুনু ইনডিকেটর  


ইমলিতলাতেই জেনেছি, প্রতিটি নারীর দেহে নিজস্ব সুগন্ধ থাকে যা শহুরে মহিলারা পারফিউম মেখে নষ্ট করে ফ্যালে , পারফিউম জিনিসটা তাই আমার পছন্দও নয় , পাড়ার সকলের বাসার মতনই আমাদের বাড়িতেও কলিং বেল ছিল না, বাড়ির কারোর সঙ্গে দেখা করতে হলে বাইরে থেকে তার নাম ধরে ডাকতে হতো । নাম ধরে ডাকার এই বাচনিক সম্পর্ক হারিয়ে গেল ইমলিতলা ছাড়ার পর। আমাদের বাড়িতে ইমলিতলার দিনগুলো নিজস্ব রঙে আর গন্ধে দেখা দিতো, রাতগুলো দেখা দিতো কেরোসিন লন্ঠন আর রেড়ির তেলের লম্ফর শিখায় । সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে লন্ঠন জ্বালানো হলে বাইরে থেকে ভেসে আসতো তাড়ি-টানা পাড়ার বাসিন্দাদের সমবেত গান :


সবকে এহি রংগ ডর বাডু রে সবকে জোরি মেঁ হথিয়ার বাডু রে

নহি নাচ বুত পলট জায়েগা সামান তোহরা ফট জায়গা

হোঠওয়া কী লালী চুসা হো নাক কে নথিয়া খুলাই হো

হনা তনি করবু তো রানি হো গোলি চলগে ছেদড়ি হো

সামান তোহরা ফট জায়েগা

হামি তা অব জওয়ান হোই নহি কে দে অব তেরতার হো

অরে নহি তো পিলান তোহরা কট জায়েগা

সামান তোহরা ফট জায়েগা


সংবাদে পড়লুম, ভোজপুরি সিনেমা জগত থেকেই পরিচিতি অথচ সেই দুনিয়ার গান নিয়েই অভিযোগ তুলেছেন অভিনেতা তথা বিজেপি সাংসদ রবি কিষাণ। তাঁর অভিযোগ, “চূড়ান্ত অশ্লীলতা চলছে ভোজপুরি গানে। তাই এই নোংরামো বন্ধ করতে কড়া আইন দরকার। এই বিষয়ে রবি কিষাণ  সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “ভোজপুরি ভাষা শতাব্দী প্রাচীন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভোজপুরি গানে যে সব শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে তা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না।  শুধু গানের লিরিকস নয়, তার উপস্থাপনও হচ্ছে অশ্লীল ভাবে।” রবি কিষাণ অমন কথা বলেছেন কেননা ভোজপুরি সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক হলেন নিরাহুয়া, যিনি বিজেপি টিকিটে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় থেকে লোকসভা নির্বাচন জিতেছেন আর নায়িকাদের জড়িয়ে যে ধরণের অভিনয় করেন তা অন্য ভোজপুরি অভিনেতারা পারেন না । 


যেকোনো লোকগানের মতন ভোজপুরি গানও ছিল নিম্নবর্ণ-নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক আস্ফালনের পরিসর। রবি কিষাণ ব্রাহ্মণ কিন্তু নিরাহুয়া নিম্নবর্ণের । নিরাহুয়ার জনপ্রিয়তার কারণও সমাজের এই বর্গে ভোজপুরি গানের আকর্ষণ, যাঁদের কাছে, গানগুলো, ইমলিতলা পাড়ার মতনই, নোংরা বা অশ্লীল বলে মনে করা হয় না । বাংলায় যে নামকরা কবিয়ালরা ছিলেন, তাঁরাও ছিলেন নিম্নবর্ণের, যেমন গোঁজলা গুঁই, নিত্যানন্দ বৈরাগী, ভবানী বেনে, রঘুনাথ দাস,  ভোলা ময়রা, কেষ্টা মুচি, যজ্ঞেশ্বর দাস, নীলমণি পাটনি, শ্যামসুন্দর স্যাকরা, জগন্নাথ বেনে, মতি পসারি, ভীমদাস মালাকার, জগা কৈবর্ত্য প্রমুখ । ভোজপুরি গান টিকে গেল কারণ ম্যাকলের শিক্ষাপদ্ধতির ছক ব্রিটিশ আমলে ভোজপুরি বলিয়ে-কইয়েদের ভৌগলিক এলাকায় তখন পৌঁছোয়নি ।


রবি কিষাণ যে ধরণের ভোজপুরি গানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন , তা আমি শৈশব থেকেই শুনে আসছি । এখন সেগুলো অভিনয় করে দেখানো হচ্ছে বলে, যাঁরা সমাজের ওপরতলায় চলে গেছেন, তাঁদের নোংরা মনে হচ্ছে। বাংলা ভাষার ডহরওয়া, পতরতুলা ,বেঁগাড়ি ,ঝুমরা, ঝুমটা, নাগপুরিয়া ,তামাড়িয়া, পাঁচপরগনিয়া ,মুদিআরি ইত্যাদি ঝুমুর গান আর কবিয়াল তথা দাঁড়াকবিদের যদি ভদ্রলোক ব্রাহ্মরা আর খ্রিস্টান পাদ্রি-শিক্ষকরা ‘নোংরা’ ছাপ্পা মেরে বিদেয় না করতেন, তাহলে এখনকার ভোজপুরি গানের মতন আমরা ভিন্ন ধরণের বাংলা গানের সঙ্গে পরিচিত হতুম ; তার লিরিক্স হতো আলাদা  । বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কৃত্তিবাস’, সুশীল রায়ের ‘ধ্রুপদী’, সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘পূর্বাশা’, অরুণকুমার সরকারের ‘উত্তরাধিকার’ ইত্যাদি কবিতার পত্রিকায় আমরা কবিয়াল, দাঁড়াকবি, ঝুমুর গায়কদের মতন নিম্নবর্ণের নাম দেখতে পাই না । হাংরি আন্দোলনের কবি হারাধন ধাড়ার কবিতা স্বীকৃতি পাচ্ছিল না বলে তিনি এফিডেভিট করে নিজের নাম দেবী রায়তে পালটে ফেলেছিলেন ।


ভোজপুরি সিনেমা জগতের সুপারস্টার  নিরাহুয়ার সিনেমা বা ভিডিও ইউটিউবে আসামাত্রই একেবারে জনপ্রিয়তার টঙে পৌঁছে যায় সেই দিনই। শুধুমাত্র তাঁর নতুন গান নয়, তাঁর একাধিক পুরনো গানও সোশ্যাল মিডিয়াতে অত্যন্ত জনপ্রিয় । তিনি ভোজপুরি সিনেমা জগতের এমন একজন তারকা যার নামেই সিনেমা সুপারহিট হয়ে যায়। তার মত তারকা ভোজপুরি সিনেমার জন্য বেশ লাভের ব্যাপার কারণ তার জনপ্রিয়তার উপরে ভর করেই ভোজপুরি সিনেমা অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। তিনি ইতিমধ্যেই এমন কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন, যে সমস্ত ছবি ভোজপুরি এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের মত রাজ্যে নিরাহুয়ার ছবি  মানেই সুপারহিট। তার সঙ্গে আম্রপালি দুবের যৌন রসায়ন যে-কোনো ভোজপুরি সিনেমায় দর্শকদের জন্য ফাঁদ পেতে রাখে। এই রোম্যান্টিক জুটির ফিল্ম তালিকায় এমন কোনো সিনেমা নেই যা ফ্লপ হয়েছে । 


সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষা-পদ্ধতির হস্তক্ষেপে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায়  বাংলা ভাষার ডহরওয়া, পতরতুলা ,বেঁগাড়ি ,ঝুমরা, ঝুমটা, নাগপুরিয়া ,তামাড়িয়া, পাঁচপরগনিয়া ,মুদিআরি ইত্যাদি ঝুমুর গান আর কবিয়াল আর দাঁড়াকবিদের বিশেষ আলাপচারিতা । শুধু তাই নয় । তারপর থেকে কর্ম ও জ্ঞানের স্হায়ী বিভাজন ঘটে যায় । আজকে আমরা চিন্তাই করতে পারি না যে একজন মুচি জুতো সেলাই করছেন, তাঁতি তাঁত বুনছেন, স্যাকরা গয়না গড়ছেন, মাঝি নৌকা বাইছেন, জেলে মাছ ধরছেন আর সেই সঙ্গে কবিতা লিখছেন আর খ্যাতি পাচ্ছেন । এনারা শ্রম বিক্রি করতেন কিন্তু আধুনিক কবিরা কবিতা বিক্রি করেন ।

প্রখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা গোবিন্দদাসের মাতামহ দামোদর সেনের 'সঙ্গীত দামোদর' গ্রন্থে প্রথম 'ঝুমুর' শব্দ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত সঙ্গীত দামোদরে উল্লেখ আছে- “প্রায়ঃ শৃঙ্গারবহুলা মধ্বীক মধুরামৃদু।/একৈব ঝুমুরীলৌকে বর্ণদিনিয়মোজ্‌ঝিতা” [প্রায়সই শৃঙ্গারবহুল মধুর মৃদু সুরার (মাধ্বীক) মতো। ঝুমুরে বর্ণাদি (বর্ণালঙ্কার ও ছন্দ) নিবদ্ধ নয়।] ঝুমুর সম্পর্কে সঙ্গীত দামোদর-এর এই উক্তি অনুসারে জানা যায়, ঝুমুর গান শৃঙ্গার রসের এবং তাতে মধুর ব্যঞ্জনা আছে। অশ্লীল বলে এই গান দোষণীয় নয়। এই গানের কোনো বাঁধা-ধরা ছন্দ ছিল না।

বিশিষ্ট ঝুমুর কবি ও গবেষক সুনীল মাহাত এক সাক্ষাৎকারে  ঝুমুর গান নিয়ে  আলাপচারিতায় সোহম দাসকে বলেছেন, “ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পরে যখন রাজন্যভাতার বিলোপ হল, তখন ঝুমুরকে মদত দেওয়ার আর কেউ থাকল না। ঝুমুরের শ্রোতা হল সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী অনেক গান রচিত হল এবং সেগুলো কিছু নিচুস্তরের যৌন-উত্তেজক  গান  হল। ঝুমুরকে সেই সময়টায় বলা হতে লাগল, ‘মাতালদের গান’। বলা হল, যারা মুনিশ, কামিন, বাগাল, মানে যারা শিক্ষিত লোক নয়, এটা তাদের গান। সেই সময়টাতে ঝুমুর ভীষণ নিন্দিত হতে থাকল। যারা শিক্ষিত সম্প্রদায়, তারা ঝুমুর সম্পর্কে বলত যে, না, না, ওইসব গান চলবে না। কলকাতারও কিছু পণ্ডিত-শিল্পী ঝুমুরকে ‘যৌনগন্ধী’ গান বলে আখ্যায়িত করল। এটা ঠিক ভদ্র সমাজে চলে না, এরকম একটা গান। আমরা যখন ঝুমুর নিয়ে চর্চা শুরু করলাম, তখন কিন্তু বাড়ির লোকরা আমাদের বাধা দিত। বাবা এসে বলতেন যে, না, না, বাড়িতে এসব ঝুমুর গান নয়, ওসব বাইরে।”


 অর্থাৎ, আদি ঝুমুর গান বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং তার জায়গায় দেখা দিল ভদ্রলোকদের ড্রইঙরুমে চলতে পারে এমন সব লিরিক্স, যাকে প্রকৃত ঝুমুর গান বলা যায় না । আদি ঝুমুর পর্বে শিল্পী ও শ্রোতারা ছিলেন প্রান্তিক অর্থাৎ নিম্নবর্গের শ্রমজীবী মানুষ। ধর্ম ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এরা ছিলেন অন্ত্যজ। এই সময়ে স্থানীয় কূর্মি, মাহাতো, কুমোর, রাজওয়ার, ঘাটাল, হাড়ি, মুচি প্রভৃতি নিম্নবর্গের মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল ঝুমুর। একই সময় ঝুমুর গান করতেন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। আদি ঝুমুর ছিল এইরকম :

 দেখ্যে বাড়ালি তকে

 তুঁই না দিলি হামাকে

 বুকের মাঝে শিমল কঁড়ি দলকে

 সেই দেখে মন ললকে।

[তোকে দেখে বড় হয়েছি। তুই সঙ্গম করতে দিলি না। বুকে তোর শিমুলফুলের মত স্তন দেখে, মন উত্তেজিত হয়েছে ]


সুনীল মাহাত আরও বলেছেন, “আগে আমরা যে ঝুমুরগুলো শুনতাম, গ্রামের মাঠে-ঘাটে, সেগুলো ঠিক পরিশীলিত বলা যায় না। এমনিতে মাঠে-ঘাটে যারা গানটা ন্যাচারালি গায়, তারা তো প্রফেশনাল গায়ক-গায়িকা নয়। তাদের গাওয়া গানগুলো ঠিক কানে লাগার মতো ছিল না।   গ্রামে  কিছু ঝুমুর নাচের দল ছিল। কম ছিল, কিন্তু ছিল।  তখন কিছু কিছু নাচনি নাচের শো হতো। নাচনিরা নাচত বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে। দেখলাম যে, তার মধ্যে ঝুমুরের অনেক ভ্যারাইটি আছে। ধীরে ধীরে যখন আমি ঝুমুরের মধ্যে প্রবেশ করছি, তখন আমি দেখছি, যে, প্রাচীনকালে এক ধরনের ঝুমুর ছিল।” 

যেমন : “আমার বঁধু রাতকানা /বাড়ি দিগে আনাগোনা/দেখ বঁধু গবর গাড়ায় ঢুকনা/আমাকে সাঁতায় না।/ঝাঁড়গাঁর হাট যাতে যাতে/বিহায়ে ধরিল হাতে/বিহাই ছাড়ো হাত/  ঝুড়ি ঝাঁটি বিকেই সাঁঝের ভাত।”

অথবা : “ভাত খাবি না মদ খাবি/হাটে যাবি না ঘরে যাবি।/বলি তোর দামটা ফুটা কড়ি তুই/আরে তোর দামটা ফুটা কড়ি তুই,/কোথা যাবি বিগাইতে।/লে লে ঝুমুর গাইলে তুই,/বোল তুলে দে মাদলে। আছিসে লগন এবার,লে লে পরব লাগায় দে।/কমলির যৌবন পুরালো,/অরে গ্যাদার মালা শুকালো রে…।/ লাল ফিতা কাঁচের চুড়ি,/মাথার কাটা, কলের ঝাড়ি।/রথের মেলায় কত লগন/দেখলি ঘুমের ঘরেতে।/ছাড় না ক্যানে খ্যামটা নাচোন,/ও তোর হ্যেড়িয়া মনের গ্যাছে লগন।আইলো যে ঝড়, কাজন মেলা,/ঝড় কদমে, বাধন জ্বালা। /সবাই মিলে মাররে ঠ্যেলা,/পাহাড় টকে সওরাইতে।/লে লে পরব লাগায় দে।”


ইউরোপের ঔপনিবেশিক ভাবুকরা ঠেকে শিখেছিলেন, যে, বলপ্রয়োগ করে নয়, উপনিবেশকে কব্জায় রাখতে গেলে, নিজেদের সিংহাসনটি বসাতে হবে নেটিভের মগজে, যাতা সাম্রাজ্য গুটিয়ে ফেলার পরও ভাবজগতটির দখলিসত্ব বজায় রাখা যায় । ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রকে তাই ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলো লোককবিদের সাথে-সাথে । গ্রামের যাত্রাভিনয়কে জেমস লঙ বলেছিলেন অশোভন ও ইতর, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরকে বলেছিলেন নোংরা, পাঁচালিগুলোকে বলেছিলেন লালসা-উদ্রেককারী ও অশ্লীল, বেতাল পঞ্চবিংশতিকে বলেছিলেন মোটাদাগের ও অশালীন । জেমস লঙের আক্রমণে বটতলা সাহিত্য তো লোপাট হয়ে গেল ।


ইংরেজদের ভাবকাঠামোয় ছিল বিশেষ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ : অনুসন্ধান, পরীক্ষা, উঁকি, সাক্ষাৎকার, নিরীক্ষণ, পরিদর্শন, তদন্ত, চরগিরি ইত্যাদি এবং বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন টেরি করা, যাতে উপনিবেশের লোকসংস্কৃতিটি ছারখার হয়ে যায়, স্মৃতি বিপর্যয় ঘটানো যায় । আমরা তাই দেখি যে জেলা গেজেটিয়ারগুলোতে ডাকাত আর ঠগিদের অনুপূঙ্খ খবর থাকলেও, প্রাগাধুনিক বাঙালি কবি, গায়ক, বাউল, এঁদের বিষয়ে তথ্য সেনসর করেছিল ব্রিটিশ শাসকরা । ইংরেজরা বিদায় হবার পর মসনদে বসেন ভদ্রলোকদের দল যাঁরা জগা কৈবর্ত্য, কেষ্টা মুচি, ভবানী বেণে, গোঁজলা গুঁইয়ের মাঝে নিজের বাপ-ঠাকুর্দাকে চিনতে পারেননি । ব্রিটিশ কর্তাদের সংস্কৃতিটি সবর্ণরা উৎকৃষ্ট মনে করে বজায় রাখলেন আর যাবতীয় দেশজকে দিলেন নিকৃষ্টের তকমা । এর কোনও স্বকীয় নান্দনিক যুক্তি নেই । ফলে মর্সিয়ার চেয়ে এলেজি হয়ে উঠল শ্রেয়, নৌরচকা ও ভাটিয়ালির চেয়ে লিরিক, লাউনি ও সারির চেয়ে ওড, সখিসংবাদের চেয়ে বেলেলেটার্স, মুর্শিদা ও নিকউবানার চেয়ে লিমেরিক, লেটোর গানের চেয়ে রক অ্যান্ড রোল ।


ইমলিতলার মসজিদে লাউডস্পিকার ছিল না ; রমজানের সময়ে একজন ফকির ভোর রাতে গান গাইতে-গাইতে যেতো যাতে পাড়ার মুসলমান পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যায় । সেই ফকিরের এক হাতে সাপের মতন ব্যাঁকা ছড়ি আর অন্য হাতে লাউয়ের মোটা খোসা শুকিয়ে তাতে লোবানের ধোঁয়া। মুসলমান পরিবারগুলো ছিল অত্যন্ত গরিব কিন্তু রোজা পালন করতো । তবু, পাড়ায় যখন ঢোল-ঢোলোক বাজিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পুরুষ আর মহিলারা এইরকম  ভোজপুরি গান আরম্ভ করত, কেউ বাধা দিতো না :


খিড়কি বন্দ কর দে দরওয়াজা বন্দ কর দে

বহিয়া মেঁ আগ বুঝবা নস নস মেঁ উঠে লহরিয়া

দিল বহর হো যায়ে না তনি প্যার হো যায়ে

বহিয়া মেঁ লেলে সাজন দহিয়া মেঁ উঠে লহরিয়া

হোটবা কে আস পাস হোটবা রহে দাস

অঁখিয়া সে প্যার ওয়ালি বতিয়া কহ দে

তনি মারজাই য়ে নজরিয়া নহি বাটে মেঁ উমরিয়া

সজিয়া সাজীই ছতরিয়া মেঁ আবা 

উর্দু সাহিত্যে কবিয়ালরা আজও সমাদৃত কেননা মুসলমান সমাজ ব্রিটিশ মূল্যবোধকে প্রতিরোধ করে নিজেদের মুশায়রা লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে । দেশভাগের আগে পাঞ্জাবিরা উর্দুতে লিখতেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও বক্তব্যটা প্রযোজ্য । গুলজারের মতো বহু কবি আজও হিন্দি কবিতা উর্দুতে লেখেন । মুশায়রায় থাকে  এক জাদু, এক ধরনের নৈকট্য ও ঘনিষ্ঠতা। একটি শায়রি, তার কবি এবং শ্রোতাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার আনন্দ, প্রতিফলন এবং আত্মীয়তার অনেক সম্ভাবনার জন্ম দেয়। আমাদের কবিয়াল, দাঁড়াকবি, তরজা, পাঁচালি, খেউড়, আখড়াই, হাফ আখড়াই, ফুল আখড়াই,  বসা কবিগান, ঢপ, টপ্পা,  তুক্কাগীতি,  লেটো, আলকাপ, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া,  আর্যা,  আর ঝুমুর গায়করা সেই আত্মীয়তাই গড়ে তুলতেন দর্শক আর শ্রোতাদের সঙ্গে । এখন এই গানগুলোর নবায়ন করছেন মূলত উচ্চবর্ণের গীতিকার-গায়ক ও গবেষকরা, যে কারণে প্রাচীনকালের জীবনপ্রবাহ, আঞ্চলিকতা, যৌনতা, স্হানিকতা, উদ্বেলিত-স্বর, বিরহের গ্রাম্য ভাবাবেগ,   গ্রামীণ নারীর প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, , আকুলতা, লৌকিক জীবনের প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ইত্যাদি হয়ে যাচ্ছে এলিট সমাজের উপভোগ্য । 

রবীন্দ্রনাথ কবিগান সম্পর্কে বলেছেন “কথার কৌশল, অনুপ্রাসের ছটা এবং উপস্থিতমত জবাবেই সভা জমিয়া উঠে এবং বাহবা উচ্ছ্বসিত হইতে থাকে—তাহার উপরে আবার চার জোড়া ঢোল, চারখানা কাঁসি এবং সম্মিলিত কণ্ঠের প্রাণপণ চীৎকার—বিজনবিলসিনী সরস্বতী এমন সভায় অধিকক্ষণ টিঁকিতে পারেন না।এই নষ্টপরমায়ু ‘কবি’র দলের গান আমাদের সাহিত্য এবং সমাজের ইতিহাসের একটি অঙ্গ, এবং ইংরাজ-রাজ্যের অভ্যুদয়ে যে আধুনিক সাহিত্য রাজসভা ত্যাগ করিয়া পৌরজনসভায় আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছে এই গানগুলি তাহারই প্রথম পথপ্রদর্শক। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন যে তিনি উচ্চবর্ণে আর উচ্চবর্গে জন্মেছেন বলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী প্রভাবিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ "আমি যদি পল্লী কৃষকের ঘরে জন্মাতাম, কিম্বা মাঝি, মালো, কর্মকার বা তন্তুবায়ের ঘরে, আর আমার যদি থাকত সহজাত কবিত্বশক্তি তাহলে আমি বড়জোর একটা কীর্তনের বা পাঁচালীর দল খুলতাম অথবা কবিয়ালরূপে গ্রামে গ্রামে গাওনা গেয়ে বেড়াতাম৷ সমাজের প্রতিকূল পরিবেশেই প্রতিহত হত আমার এর চেয়ে বেশী কিছু হওয়ার সম্ভাবনা৷ আমি জানি অনেক সম্ভাবনীয়তার কুঁড়িই এভাবে অকালে ঝরে যায় যেগুলি ফুল হতে পারে না এবং দেখেছিও তেমন দু'দশজন৷" 

রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য অনেকটা রবি কিষাণের মতন । ইমলিতলার বস্তিতে শৈশব কাটালে তাঁর মতামত নিঃসন্দেহে আলাদা হতো ।


সুবীর সরকারের গদ্য 

একাকীত্বের ভেতর গান বাজে,একাকীত্ব আসলে নির্জন হাসপাতাল




১.
কবেকার কোন এক হেমন্তের হাটে হেমকান্ত দেখে ফেলেছিলেন সেই জোড়া কৈতর। আর হাটে ঢুকে পড়া মেয়েরা তাদের শরীরে নাচ নিয়ে শুরু করেছিল গান_
"আরে নবরঙ্গের ময়না
ময়না না যান গৌরীপুরে রে"
নাচের পর নাচ গানের পর গান চলে,চলতেই থাকে
হেমন্ত জুড়ে।মাঠে মাঠে সোনার ধান।
মানুষের ঘরবাড়ি থেকে দৈনন্দিন কথা বার্তা ভেসে।
হিমে ভেজে খোলানের নিঃসঙ্গ আখা।
দূরে কোথাও আগুন জ্বলে ওঠে।
আগুন ঘিরে মানুষের ছায়া আবছায়া।
আল ও আলি দিয়ে দৌড়ে পালায় হেমন্তের ছাইবর্ন শৃগাল।
রহস্যময় মনে হয়,মনে হতে থাকে দূরে কাছের গ্রামদেশ।
মস্ত চাঁদ ওঠে। জোড়াদিঘির জলে চাঁদ আর সুপুরি গাছের ছায়া।
কোথাও পুঁথি পড়া হয়।
আর গান জেগে ওঠে_
"বাপরে বাপ কি জাড়
মাওরে মাও কি জাড়
জাড়ত কাপে দেখং এল্যা
দিন দুখির সংসার"
এভাবে জীবন সেজে ওঠে।জীবন প্রবাহিত হয়।
জন্ম আর মরণের ঘোর জাগিয়ে রেখে
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন হেমকান্ত।
আর হেমন্তের মাঠে খেতে হাহাকারের মতন ছুটে
যায় গান_
ওরে মানুষের দেহা
পবন গেইলে হবে মরা"
২.
হেউতি ধান,পাখির পালক,শেষ হেমন্তের নদী,ধান নিয়ে ঘরে ফেরা কৃষক,নির্জন কলাগাছের পাতা_এই সব দৃশ্যের মায়া আর ম্যাজিক কেমন নিরিবিলি করে দেয়।
এই সব আসলে চিরকালীন,আবহমান।
যেভাবে জীবনের পর জীবন মানুষ বাঁচে,মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।
পুরোন মানুষ হারিয়ে যায় এই মর পৃথিবী থেকে।
নুতন মানুষ বেঁচে থাকাটাকে ছুঁয়ে থাকে।
জন্ম জন্ম জুড়ে এ এক ধারাবাহিক পক্রিয়া।
ছয় নদী আর নয় ফরেস্ট জুড়ে জুড়ে গল্প নির্মিত কিংবা বিনির্মিত হতে থাকে।শিমুল গাছের শরীরে নখের আচড় রেখে আসে চিতাবাঘ।
হাতির পাল নেমে আসে উত্তরের ধানবনে।
নদীর শিথানে খুব নির্জন হয়ে বসে থাকে সেই আবহমান কালের বগা বগি।
এই জীবন তো আদতে এক ফাঁদ।
আমরা সবাই "ফান্দে পড়িয়া কান্দি"!
আর কার্তিকের কুয়াশায় ভেসে আসে গান_
"চাষার মুখত আর
নাইরে সেই গান"।
জীবনের অদ্ভুত এক মায়া আছে।দূরাগত হাওয়ায় বুঝি জীবনেরই ঘ্রাণ ভেসে আসে!কত কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।গল্প হয়।মানুষের জীবন জুড়ে না ফুরোন কত গল্প।রতিকান্ত পাইকারের গল্পে কখন বুঝি মিশে যেতে থাকে হাতি জোতদারের হলুদ খামারবাড়ি।আমি নদী পেরিয়ে,চরের পর চর পেরিয়ে হেঁটে যেতে থাকি এরাজ ধনীর জোতে।এইসব আসা যাওয়ার মাঝখানে ছায়া ফেলে জোনাকির আলো। কোথাও দোতরা বেজে ওঠে।দেহতত্ত্বের গান উঠে আসে আর ঘুরে বেড়াতে থাকে টাড়ি বাড়ি নদী উপত্যকা জুড়ে।
এভাবেই জীবন কিভাবে বুঝি উদযাপন হয়ে ওঠে!
৩.
সব হাট কি একরকম!সোমবারের হাটের ভেতর কি খুঁজে পাওয়া যাবে বুধবারের হাট! তামারহাটের রঙের সাথে কি পুরোপুরি মিল থাকা সম্ভব রতিয়াদহ
হাটের!ছত্রশালের হাটের পাখিদের কি দেখা মেলে পানবাড়ির কোন এক শনিবারের হাটে!
সব হাট একরকম হয় না।সব গান একরকম হয় না।
সব গঞ্জ আর গাঙ একরকমের হতে পারে না।
প্রবেশ আর প্রস্থান দিয়ে এক একটি হাটপর্ব রচিত হতে থাকে।আর লোকমান পাগলার হাটে ধুলোর ঝড়সমেত ঢুকে পড়ে জোড়া মহিষ।গদাধর নদীর কোন বা চর থেকে বাথান ভেঙে এরা বুঝি চলে এসেছে এই হাটে ভেতরে।সমস্ত হাট জুড়ে একটা হুড়াহুড়ি লেগে যায়।মানুষের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ।তখন কোথায় ইয়াকুব ব্যাপারী কোথায় মহিউদ্দিন ওস্তাদ কোথায় লোকমান!ভরা হাটের কোলাহল থেকে সরে আসতে আসতে ময়কান্ত মৈশাল তখন খুঁজতে শুরু করে বাথান পালানো সেই জোড়া মহিষদের।তার হাতে দীর্ঘ পেন্টি।মাথা গামছা দিয়ে পাগড়ির মত করে বাঁধা।প্রায় তিন কুড়ির পেশীবহুল সুঠাম শরীরের পেশীগুলো একত্রিত করে 
ময়কান্ত তার কণ্ঠে তুলে আনেন মহিষের কণ্ঠের আকুতি।এই ডাক শুনে সেই জোড়া মহিষ কেমন থমকে দাঁড়ায়।তাদের বড় বড় চোখে কেমন মেঘের ছায়া!একটু বাদের দেখা যাবে সেই জোড়া মহিষ অদ্ভুত আহ্লাদ নিয়ে হেলে দুলে ময়কান্তর পিছনে পিছনে সেই বাথানের পথ ধরে ফেলেছে।গদাধর নদীর কোন বা চরের খুব অন্দর থেকে ভেসে আসছে 
হাহাকার ভরা গানের সুর_
"আরে ও  মৈষের  দফাদার ভাই
ডালা সাজাও ডালা সাজাও
চল মৈষের বাথানে যাই রে"
ময়কান্ত তার জোড়া মহিষ নিয়ে বাথানে চলে যেতে থাকে।কিন্তু হাট ভেঙে যায়।
৪.
ইয়াকুব ব্যাপারী মহিউদ্দিন ওস্তাদ লোকমান পাগেলাকে ভুলে গিয়ে আপাতত আমরা ঢুকে পড়তেই পারি বালাজানের হাটে।গঙ্গাধরের বাতাসে নদীর বালু উড়ে আসছে হাটের মস্ত খোলের ভেতর।শরীর ভরতি বালুকণা মেখে গরুহাটির উত্তর শিথানে
চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সাজু  চোরা।না,সাজু চোর নয়।তার নাম সাজু মোহাম্মদ। হাটে হাটে গরুর দালালি করে বেড়ায়।আর "চোর চুন্নি" পালাগানে
সাজু চোরের ভূমিকায় অভিনয় করে।তার শরীরের পরতে পরতে তীব্র এক নাচের ছন্দ লুকিয়ে আছে।সাজু চোরার পালা দেখার জন্য মানুষ হামলে পড়ে গানবাড়িতে।সাজু মোহাম্মদকে এখন আর কেউ চেনে না।সবাই সাজু চোরাকে একনামে চেনে।সাজু যখন নেচে নেচে শরীরে অদ্ভুত পাক দিতে দিতে গেয়ে ওঠে_
"ও কি হায়রে হায়
আজি মনটায় মোর পিঠা খাবার চায়"
তখন সমগ্র গানবাড়ি জুড়ে কি এক উন্মাদনা!
সাজু চোরা ছিল গানমাস্টার মঈনুদ্দিন এর শিষ্য।
মঈনউদ্দিন আবার ছিল আলাউদ্দিন এমেলের সাকরেদ।সারাজীবন এই গান,এই নাচ,রাতের পর রাত গানবাড়ি নিয়েই জীবন কাটে সাজু চোরার।
গরুর দালাল সাজু চোরা গরুহাটির ভেতর দাঁড়িয়ে 
কি ভাবছিল!রহস্যমোড়া গানবাড়ির কথা।নাকি সওদাপাতি নিয়ে বাড়ি ফিরবার কথা!তার শরীর জুড়ে নাচের ছন্দ ক্রিয়াশীল থাকে আর হাটের অন্ত মধ্যে সাজু ছড়িয়ে দিতে থাকে গুনগুন সুরের কোন এক গান,যা দূরাগত হওয়ার ডানায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমস্ত হাটের পরিসরে_
"ওরে ফুলবাড়ীত ফুলমালার বাড়ি
হাট করিতে যামো হামরা গরুর গাড়িত চড়ি"
এইভাবে পুরোন হাটপর্ব শেষ হয়ে যায়।নুতন নুতন হাটগুলোর হাট হয়ে উঠবার জন্যই হয়তো বা!
৫.
এভাবে মাঠে মাঠে খুব একা হয়ে উঠতে গিয়ে নির্জন ঘোড়াটির পিছে পিছে আমিও হাঁটি।আমার শরীরের দুলে ওঠায় খুব একা আর একক এক সঙ্গ নিঃসঙ্গতা জড়ানো পরিক্রমণ আছে।
আসলে আমরা ভেতরে ভেতরে খুব একাই।
নাচ গান বাদ্য বাজনার এই দেশ দুনিয়ায় আমাদের আস্ত এক বেঁচে থাকাটাই একাকীত্বের অদ্ভুত এক ম্যাজিক দিয়ে জড়ানো।
কোথাও একা খুব একলা এক পাখি ডেকে ওঠে তীব্র এক হাহাকার নিয়ে।সেই হাহাকারের ভেতর আমি গুঁজে দিতে থাকি সোমবারের হাট,হলুদ লাটিম আর খুব একাকীত্ব নিয়ে জেগে থাকা সীমান্ত শহরের নির্জন হাসপাতাল।আর একাকীত্বের ভেতর গান বাজে।

Wednesday, August 4, 2021

 পথ গুলিয়ে ফেললে 

সব্যসাচী ঘোষ 



আমাদের সেই ছেলেটির নাম হত দিবাকর। আরো অনেকের মত লিখতেই এসেছিল সে। তাঁর বাড়িটি হত রাজ্যটির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক একমাত্র কেন্দ্রটির থেকে প্রায় ৭০০ কিমি দূরের আধা মফস্বলে। সবার মত একটি নদীও ছিল তার। কি জানি তারই নাম হয়তো কালজানি।  

গত শতাব্দীর ৫০এর শেষ দিকে সে জন্মেচ্ছে। ইস্টিশনের কাছেই, হবে কোন এক রেল কোয়ার্টার। বাবা অনেকটা কিনু গোয়ালার গলির বাঁশি কবিতার নায়ক। আলো জ্বালাবার দায় বাঁচাতে গাছ গাছড়ার ব্যবসা খুলতেন।

কিশোরবেলায় বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনে ফেলত দিবাকর। তাই সে তখন আর সবাই এর মতন একটা অন্যরকম যৌবনকালের জন্যে ছিল অপেক্ষারত। অন্যরকম মানে অন্যরকম। যেখানে অন্য গান হবে, অন্য লেখা হবে আর অন্য বই পড়া হবে, লেখকেরাও হবে অন্য। হুড়মুড় করে গর্জন সত্তর উপস্থিত হত এরপরই। সে এক বড় পাগলামোর দশক এবং সে যুবক হত। সময়ের দোষ আজীবনের বদভ্যাসে বদলে যায়। কৈশোরের তারল্যের নেশা যৌবনে পান করত দিবাকর। বইয়ের গন্ধ ভাল লাগত। তাই কি ছাপাখানার অংশীদার হল সে। “যুক্তপ্রয়াস”। বই ছাপা হত, বাঁধাই হত। কম্পোজ কম্পোজ আর কম্পোজ। দিবাকরের আশির দশক চলেছে ছাপাখানার গা বেয়ে। রাত্রিতে ফুটপাথ প্রতি রাতেই বদলও হত।  

অমলকান্তির শেষ পরিণতি দিয়ে দিবাকরের শুরু, কার্যত শেষের শুরুও কি বলা যায় না তাঁকে? দুই দিনের বাসি পচা খবর ট্রেনে করে নামত দিবাকরদের আধা মফস্বলগুলোতে। ক্ষুধার্তের দল সেই বাসি পচাই পড়ত। আশির শুরুতে একজন বিকল্প ভাবলেন। নদীর এপার থেকেই নদীর এপারের খবর ছাপার কথা ভাবলেন। বাজার বুঝতে সমীক্ষা ও সুমারি চলল উত্তরের পাহাড়, বন, চা বাগান, চাষ জমি নিয়ে। দিবাকর সেই প্রত্যয়ী সংবাদপত্রে তখন সমীক্ষক যুবক। আত্মবিশ্বাস বাড়ত দিবাকরের। প্রশ্ন করত দিবাকর, “বই এর জন্ম দিতে ৭০০ কিমি দূরের শহরটিতে ছুটতে হবে কেন?” রাস্তাতে মিসক্যারেজের সম্ভাবনার ভয় পেতই নদীর উত্তরের কাগজ ঘসটানো মানুষেরা। দিবাকর এভাবেই একটি নতুন চাষজমির খবর পেত। “মনচাষা”র জন্ম এরপর হত। তাতে নতুন নতুন বই হত। নোয়াম চামস্কি বলেছিলেন চার কিমি গেলে ভাষা বদলে যায়, দিবাকর তো ভাষার শক্তিনিয়ন্ত্রক মহানগরটির থেকে ৭ শত কিমি দূরে, আর চামস্কির মার্কিন দেশ থেকে ১০ হাজার কিমির বেশি। দিবাকরের এই দূরগামী অবস্থানে হয়তো প্রভাবিত হয়েছিলেন ভাষাবিদ। এরপর চামোস্কি থেকে রামকিংকর বাঁধাই হতেন আধা মফস্বলের লেটার প্রেসে। এই প্রতিবেদকের বাবা সমীরণ ঘোষ তখন ঘোষিত ক্ষুধার্ত। উত্তরের প্রধান শহরটিকে তখন ১০ বছর শাসন করার অভিজ্ঞতা তাঁর। একা নন রাজা সরকার, মনোজ রাউত, অলোক গোস্বামী প্রমুখেরাও অগ্রণী হতেন। জুটি বেঁধে মাঝেমাঝে চলে আসছেন আরেক মফস্বলের ওষুধ বিপণির পরিবারের কবিতা পাগল ছেলে অভিজিৎ পরে অন্যমন। জল শহরে “ক্রুসেড” বাহিনী বিজয় দে এবং সমর রায় চৌধুরী “পাগলাঘোড়া”র সওয়ার হতেন। এদের সঙ্গে দেখা হলে অবাক করতেন দিবাকরই। তীব্র যোগাযোগে সে তখন আন্তর্জাতিক। মিথ্যে আর সত্যি যেন দিবাকরের পাশে দুই বিশ্বস্ত কুকুর। মহানগর তখন তাঁর নিয়মিত গন্তব্যে। বই হল উত্তরের কবির। বই হল দক্ষিণের কবির। বাঙালির চিরন্তন গড়ের মাঠে দিবাকরের বিজয়কেতন উড়তে দেখতে পেতেন অনেকেই। উত্তরের সাহিত্যের ইতিহাস লেখা হলে সেদিন দিবাকরের ওতবড় স্টল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার পদক্ষেপগুলিও লেখা উচিৎ।    

৯০ এর দশক। যখন কম্পিউটারটাকে ঠিক কতদূরে বঙ্গোপসাগরে ফেললে সে বাংলার ঠিকানা হারিয়ে ফেলবে বলে আলিমুদ্দিন অঙ্ক কষছে ঠিক তখুনি ডিটিপি শব্দের আক্ষরিক প্রয়োগেও দিবাকর হতেন প্রদর্শক। কিন্তু সব হচ্ছিল ব্যবসাটাই শুধু হচ্ছিল না বুঝি। যেখানে শুধু সংস্থার প্রকাশনীর ব্যবসা দেখার একাগ্রতায়  সাহিত্যের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ধরা না দিয়ে ‘পিওন থেকে প্রকাশক’ হয়ে উঠেছেন কৃষ্ণাঙ্গ দীর্ঘদেহী বাদল বাবু সেখানে শুধু সাহিত্যের আবেগে থরথর কম্পমান দিবাকর স্টলের বই বিক্রির টাকা একেক রাতেই ওড়াচ্ছেন। স্রেফ হিসাবের ভুলেই অংশীদারিত্বে ভাঙন তখন অবশ্যাম্ভাবী। শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিকের হারাবার আর কিছুই নেই স্লোগানকে দিবাকর একটু ভুল পড়েছিল। তাই শৃঙ্খলা লোপ পাচ্ছিল ধীরে ধীরে।   

ফলত যে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি নার্ট বল্টু নিয়মিত তৈল মর্দনে ঘোরে সেখানে দিবাকর কিঞ্চিৎ শুষ্ক হচ্ছিলেন। ক্রমশ আরও শুষ্ক। ভাল মানুষের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেও বোধহয় তীব্র অস্বস্তি হচ্ছিল ওঁর। বিয়ের পর তিন সন্তান। কিন্তু অপত্য স্নেহ জাগলো কই। এ ব্যর্থতা কার। নিশ্চিত পিতার। টাইটানিকের সঙ্গে হিমশৈলের ধাক্কা তখনই লেগে গিয়েছে।

এদেশ শিল্পীর জন্যে কেন কোন মমার্ত বানানো হয় না? বিডিও অফিস কেনো দ্যায় না প্রকাশকশ্রী, কবিশ্রী, লেখকশ্রীর দুয়ারে ভাতার ফর্ম? এপোড়া দেশ যে সেসব দেবে না সেকথা বহুদিন আগেই বুঝে গিয়েছিলেন এক দিদি। রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিল “এক কর্মভারে অবনত অতি ছোট দিদি” এখানেও তেমনি থাকেন এক দিদি। দিবাকরের আঙুল যিনি ছাড়েন নি। জীবনের সবটা সঞ্চয় একসময়ে দিবাকরকে তুলে দিয়েছিলেন। শূন্যের দশক হত সেটা।


(দিবাকর ভট্টাচার্যের তিনটি কবিতার বই, ‘কলম্বাসের মোম’ , ‘খাকি বাতাসের কবিতা’ এবং ‘কথা উপকথা’।

দুটি গদ্যের বই “নির্দিষ্ট নাথ” এবং ‘ভাগাভাগির সময়’।)


(পরের সংখ্যায় শেষ কিস্তি)

Tuesday, August 3, 2021

 নিজেস্ব অনুভূতির ধারা 

                                    সোমা সাহা পোদ্দার



কিছু পরিচয়ের মুহূর্ত অজান্তেই বয়ে চলে ভাবনায়, কোন সঠিক দিক হয়তো নেই তবু এক নেশার অন্তরালে ডুবে যাচ্ছে দিনক্ষণ সারাক্ষণ। শ্রাবণ মেঘে আসে যায় মননে বাজে কিসের ঝলক তবু ছুটে চলে দিগন্তে, কখনো হালকা হাওয়া ভিজিয়ে দেয় সময়ের ছাপ রেখে।

            এই প্রথম ডঃ প্রদীপ কুমার এর কাছে যাচ্ছি ,উনার সম্পর্কে আগেই শুনেছি অনেকের কাছে। অ্যাস্টার সিএমআই হসপিটালে ১০:৩০ তে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল বাবার জন্যে। প্রচুর লোক বসে আছে আমরা অপেক্ষা সরিয়ে ভেতরে যেতেই সাধারণমাখা হাসি দীপ্ত চোখ স্বাগত জানাল।  একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যিনি নারায়ন হৃদয়ালয় থেকে শুরু করে বিখ্যাত হসপিটালের সাথে কর্মসুত্রে যুক্ত ছিলেন। এই করোনাকালীন সময়েও বাবাকে নির্দ্বিধায় চেকাপ করলেন জানতে চাইলেন বাড়ি কোথায়, আলিপুরদুয়ারে এখনও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার যে তেমন কোন ব্যবস্থা নেই শুনে অবাক হলেন। ভাষার সমস্যায় বাবার কিছু কথা ডাক্তারকে আর ডাক্তারের কথা বাবাকে বলার চেষ্টা করছি। রিপোর্ট দেখার জন্যে যে ফাইলটা এগিয়ে দিচ্ছি সব টেস্টই দেবী শেঠির ওখানেই করানো ইকো,ইসিজি, ট্রেডমিল সবই নর্মাল পরে সিটিস্কেনে একটি ব্লকেজ ধরাপরলে অ্যাঞ্জিওগ্রাম করতে বলে।ফেরার পথ প্রায় তিন ঘণ্টা আজ প্রথম লকডাউনের সময়সীমা বাড়িয়েছে প্রচুর ভির সকাল থেকে সন্ধ্যা গরাচ্ছে হাত মুখ মাথা ঢাকা জলও খাওয়া হয়নি এভাবেই দিনক্ষণ চলে যায়।

            নিজেস্ব ভাবনা ছাড়িয়ে ইচ্ছেগুলো তবু রঙবর্ষায় ভিজতে থাকে, ছুঁতে চায় নীল আকাশের গভীরতা।দুহাতে যারা ফিরিয়ে দেয় আবার নতুন শ্বাস সেই স্পর্শের ঈশ্বর  ও টি পি তে যাচ্ছেন । শুধু দেখি নীরবতা বিছিয়ে কথার ওপারে হঠাৎই নাড়া দেয় ভেতর পানের এই পাওয়ার কোন ফিরিয়ে দেওয়া হয়না সময় ডোরে অনুভূতির উপহার হিসেবে বাঁধা থাকবে। জলের গভীরতা বেশি হলে বালির সচ্ছতা কেঁপে উঠে নাদেখায় তবু জলে তিরতির অপেক্ষা বয়। আঁকিবুঁকি গতিপথ সরিয়ে ব্যাস্ততার ফাঁকে গাঁ এলিয়ে দেওয়া আজও একই সবুজতায়। শান্ত পৃথিবীর বুকে একফালি রোদ মাখা প্রিয় শব্দ কুঁড়োই শ্বাসে শ্বাসে কমে আসুক বিরতি। তোমার ঘুমের ভেতর কেউ জেগে আছে  লেখায়।    

          আবার সকাল ঠেলে অ্যাস্টার হসপিটালে বাবা আর আমি দুটো কোভিদ নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে ৮   টার আগেই পৌঁছে গেলাম। নার্সদের যা করনীয় তা শেষ হতেই ডাক্তার এসে অ্যাঞ্জিওগ্রাম করার পর আমায় ডেকে স্কিনে দেখাতে দেখাতে জানতে চাইলেন অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি কবে করাছি ওষুধে এই ব্লকেজ ভালো হবে না। কিছুদিন পর কি করানো যেতে পারে বাবার ইনসিওরেন্স নেই বলাতেই, ডাক্তার আমায় বুঝিয়ে বলছিলেন বেশি দেরি করাটা ঠিক হবে না তবে  আমি বলে দেবো কমেই হয়ে যাবে অসুবিধে নেই। তুমি ঠিক করো কবে করাতে চাও। মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব তেমনি ঈশ্বরের ন্যায় ডাক্তার।

             সাতদিন পর আবারও কোভিড টেস্টের নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে হসপিটালে ৮০% টাকা জমা দিয়ে বাবাকে আইসিইউ তে  রেখে বাইরে রয়েছি ভাই ভেতরে, ডাক্তার এসে আমাকেও ডাকলেন সার্জারি পর স্কিনে দেখিয়ে বললেন অনেককিছু ব্যস্ততার মাঝেও। চারদিন পর চেকাপে সবকিছু এতটা মানবিকতার সাথে সুন্দর করে বলছিলেন কেউ যখন ব্যস্ত থাকে কারও তখন চুপ করে দেখতে হয়, একটু চুপ ভেঙে জানতে ইচ্ছে করলো স্যার ,আপনার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে? ব্যাঙ্গালোর,উনি যখন ফ্রী থাকেন স্পোর্টস দেখতে ভালবাসেন। প্রথমবার একা হসপিটালের সাথে আমার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করছি যদি আমার দেখা এই পাঁচ ছয় দিনের জার্নিতে আপনাকে নিয়ে লিখি আপত্তি নেই তো- আপনি লিখুন কোন অসুবিধে নেই। আসার সময় উনার ফোন নাম্বার নিজেই লিখে দিলেন শুধু অবাক হচ্ছিলাম এসব হসপিটালের ডাক্তারদের নিজেস্ব ফোন নাম্বার সাধারণত্ব দিয়ে থাকেনা। পাশে দাঁড়িয়ে ছবিতোলার সময় নিজের মাক্সটা খুলতে খুলতে মুখ ঢাকা থাকলে কি করে চেনা যাবে সেটা দেখে আমিও মুখোশ খুলে লম্বা শ্বাস নিয়ে বাইরে এলাম।     

       ভিরের মাঝেও কিছু গুড়ো হাওয়া উড়ে আসা শব্দক্থায় দিনরাতের হিসেব খুলে ধীরে ধীরে যখন দৃশ্যায়িত হয় আমরা যাকে বলি প্রকৃত অর্থে ডাক্তারের রুপে ঈশ্বর। আমরা কাহানী গড়ি ভাঙ্গি কিছু জীবন্ত ছায়ারেখা হেঁটে যায় তাকে কি নামে ডাকব? এই দেখা অভিজ্ঞতায় অজানা না বলারাও মিশে থাক তবু ফিরে আসে গানে গানে অচেনা পথে পাখিও প্থিকের সংকেত গায়। আবছা ভোর লেপে সহজতায় ছুঁয়ে যায় বৃষ্টির বৃষ্টিরূপ। বয়ে চলুক ঋতুর ওঠানামায় রূপান্তরিত জলের বৃষ্টি গল্প  প্রিয় ছবিতে জলছাপ রেখে। 

 


অন্য প্রভাত ও স্মৃতিচারণ
মাধবী দাস

"কালো চুলে পাকা দাড়ি ,দীপ্ত চোখে অদ্ভুত সুষমা
কপালে চিরহরিৎ অরণ্যের শোভা
মগজে বিনিসুতোর মালা 
বুকের চাতাল জুড়ে শব্দের বৃষ্টিরা
প্রকৃত সাধক যেন স্বয়ং রামধনু ...

ছোট সংসারটি কবিতার পালকে পালকে মোড়া
চায়ের আড্ডায় প্লেটে বসে থাকে উষ্ণ চাওমিন
চুমুকে পেখম মেলে মনের ময়ূর
আকাশের রং বদলে যায়
দু- ফোঁটা কালিতে

গভীরতম দুঃখগুলো মধুরতম হলে
ঘোড়া ছোটে আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকের পথে 
রাশি রাশি কবিতার মিউজিয়াম দরজা খুলে দেয়..."

১৪২৪ 'কৃতি এখন' পত্রিকার বর্ষবরণ সংখ্যায় সম্পাদক কল্যাণ চট্টোপাধ্যায় 'প্রভাত চৌধুরী' শিরোনামে আমার লেখা এই কবিতাটি ছেপেছিলেন। প্রভাতদা সম্পর্কে কিছু লেখার আগে আমার এই কবিতাটি দিয়ে শুরু করার পেছনে একটি কাহিনি আছে। কলকাতায় গেলেই প্রভাতদার পটলডাঙা স্ট্রিটের বাড়িতে যাওয়াটা আমাদের পরিবারের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কবিতাপাক্ষিক যেহেতু অনলাইনে লেখা গ্রাহ্য করে না, তাই যখনই যেতাম কয়েকটা লেখা প্রভাতদার হাতেই দিয়ে আসতাম। ডাকযোগে লেখা পাঠানো আমার ইচ্ছে থাকলেও নানা কারণে হয়ে ওঠে না। ২০১৫ সালের প্রভাতদার জন্মদিনের ঠিক দু-মাস আগে প্রায় দশ-বারো খানা লেখা প্রভাতদার হাতে যখন দিলাম তার মধ্যে এই লেখাটিও ছিল ।বারবার পড়ছিলেন। সামনে বসে ছিলাম আমি ।মনে মনে খুব খুশি হচ্ছিলাম এই ভেবে লেখাটি কবিতাপাক্ষিক- এর জন্মদিন সংখ্যায় মনোনীত হয়ে গেল ভেবে। সব আশায় জল ঢেলে দিয়ে প্রভাতদা বললেন --বেশ ভালো লিখেছ ,তবে এটা আমার কাছে রেখে দিচ্ছি ।এটা 'কবিতাপাক্ষিক' ছাপবে না ।কারণ জিজ্ঞাসা করার সাহস আমার নেই বলেই ,মনে একটু কষ্ট পেলেও ,মুখে বললাম -- ছাপা না হোক, আপনার ভালো লেগেছে এটাই আমার প্রাপ্তি। এই হলেন প্রভাতদা। কখনওই নিজের ঢাক তো বাজাবেনই না ,অন্যদেরও বাজাতে দেবেন না। 'কৃতি' সম্পাদক কল্যাণদার প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, এই লেখাটি(একটু পরিবর্তিত) তিনি পরবর্তীতে ছেপেছেন বলে। কবিতাটি যতবার আত্মপাঠ করি ততবার যেন চোখ বুজে প্রভাতদাকে দেখতে পাই।
কোচবিহারের মতো প্রান্তিক শহরে বেড়ে উঠেছি আমি ।ছোট থেকেই টুকটাক লেখালেখি করতাম ।দাদা কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় কোনও এক কবি বন্ধুর কাছ থেকে আমার জন্য আকাশি নীল আর হলুদ রঙের মলাটের কবিতাপাক্ষিক লেখা দুটি চটি পত্রিকা হাতে দিয়ে বলেছিল --'লিখতে হয় তো আগে এই পত্রিকা দুটো ভালো করে পোড়ে নে ।জানিস প্রভাত চৌধুরী কে ?গোটা কলকাতার তরুণ কবির আশ্রয়স্থল কবিতাপাক্ষিক।' সালটা ১৯৯৬ -৯৭ হবে ।আমার লেখালেখি তখন ডায়েরির পাতা ছাড়িয়ে বাড়ির দেওয়াল টপকে স্কুল ম্যাগাজিন ও নবলিপি, কৈশোর, ঝড়-তুফানের মতো কোচবিহারের দু-একটা লিটল ম্যাগাজিনে মুদ্রণ রূপ পেয়েছে। কবিতাপাক্ষিক এর পাতা উল্টে পাল্টে পড়ার পর ইচ্ছে হয়েছিল ডাকযোগে গ্রাহক হই ,কিন্তু সেই সময় বাবা-মা চাইতেন পড়াশুনা শেষ করে এসব নিয়ে যেন মাতামাতি করি । 
তারপর দীর্ঘ প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আমার আর কবিতাপাক্ষিক পড়া হয়নি। নিজের লেখাও চলছিল গদাইলস্করি চালে। চাকরি জীবনে প্রবেশ করার পর হাতে এল মোবাইল। জয়েন করলাম ফেসবুক দুনিয়ায়। পরিচয় হলো বাংলার বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে ।ঠিকানা নিয়ে লেখা পাঠানো শুরু করলাম ।'কবিতা আশ্রম',অদিতি ,'আজ রোববার 'এমন কিছু কিছু পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত যখন হচ্ছিল তখন একদিন কবিতাপাক্ষিকের এডিটোরিয়াল বডির সদস্য আফজাল আলী কর্মজীবনে বদলি হয়ে কুচবিহারে এসে লেখালেখির সূত্র ধরেই আমার বাড়িতে এলেন। আলাপচারিতায় কবিতার প্রসঙ্গ আসতেই , আমার কবিতা পড়ে নিজেই কিছু কবিতা নিয়ে গেলেন প্রভাতদাকে দেখাবেন বলে। তার আগে তিনি জানিয়ে গেলেন প্রভাতদা সম্পাদনার ক্ষেত্রে কতটা কঠোর। অতএব শেষ কথা উনি বলবেন। কিছুদিন পর আফজালদার মুখেই জানতে পারলাম দশটি লেখার মধ্যে আমার মাত্র দুটি লেখা মনোনীত হয়েছে। বাকি কবিতাগুলো কেন মনোনীত হলো না ,কী হলে মনোনীত হত এসব জানানোর জন্য প্রভাতদা একদিন নিজেই ফোন করেছিলেন।---'আমি প্রভাত চৌধুরী বলছি' গলাটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। প্রভাত চৌধুরী ফোন করছেন আমাকে? নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তারপর প্রায়ই ফোনে কথা বলতাম। কোন সময় তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি। প্রথম দিনের কথাই বুঝতে পেরেছি কতটা আন্তরিক তিনি। যখন যেভাবে জানতে চেয়েছি। ফোনেই সেই সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন ।আজও তাই দিয়ে থাকেন।
২০১৬ সালে নিরুক্ত পত্রিকার অনুষ্ঠানে কলকাতা যাব শুনে প্রভাতদা পটলডাঙ্গা স্ট্রিটের বাড়িতে ডাকলেন কবি বন্ধু শাহাবুদ্দিন ফিরোজের সঙ্গে শিয়ালদার হোটেল থেকে আমরা সপরিবারে পটলডাঙা স্ট্রিটে চাপা গলি পথ দিয়ে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছালাম 'কবিতাপাক্ষিক' দপ্তরে। বইয়ের সাম্রাজ্যে রাজা হয়ে বসে আছেন তিনি। উল্টোদিকে চেয়ারে বসে ছিলেন একজন রাশভারী মানুষ। যার চোখের দিকে তাকালেই মাথা নত হয়ে আসে। সেই নাসেরদার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিলেন নিজেই। ভেতরঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আটপৌরে শাড়ি পরিহিতা বৌদি। সে এক অদ্ভুত আন্তরিকতা! যেন কত দিনের পরিচয়! বৌদি, নাসেরদা দুজনকে প্রণাম সেরে আমরা যখন প্রভাতদার পায়ের কাছে গিয়েছি।প্রভাতদা আঙুল দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়ে বললেন- যতদিন উনি বেঁচে আছেন আমি প্রণাম নেব না কারও।ছেলে,ছেলের বাবা, মুখ টিপে হাসছিল! আমি কিন্তু প্রভাতদার অনুভূতি বুঝতে পেরেছিলাম , আরও বেশি করে বুঝতে পেরেছিলাম নীলিমা সাহা সম্পাদিত 'নিনি' পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রভাতদার সেই সাক্ষাৎকারটি পড়ে। কতটা আত্মমগ্ন হয়ে রবীন্দ্রনাথকে তিনি ভালবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, এই লেখাটি না পড়লে বোঝা যাবে না।
'মধু তিষ্ঠতি জিহ্বাগ্রে হৃদয় তু হলাহল'--এই মতের তীব্র বিরোধী প্রভাতদা ।সস্তা সৌজন্যবোধ তাঁর একদম নেই। মুখে আর মনে তিনি একজন মানুষ। কবিতা লিখতে এসে কেউ বানান ভুল করলে তাই তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান ।ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু পরমুহুর্তেই হাতে ধরে সব শিখিয়ে দেন।বাংলার ছাত্রী ও শিক্ষিকা হয়ে যতটা বানান সম্পর্কে জেনেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি শিখেছি প্রভাতদার বকা খেয়ে খেয়ে।এই বকাকে যাঁরা তিরস্কার ভেবেছেন তাঁরা দূরে সরে গেছেন অভিমান করে। আর যাঁরা বুঝেছেন এই তিরস্কার আসলে তরুণদের নিঃস্বার্থ তৈরি করার পন্থা তাঁরা আজীবন এই তিরস্কার শোনার জন্য প্রভাতদার কবিতাপাক্ষিক -এর বইয়ে ঠাসা ঘরটিতে ঘুরে ঘুরে যাবেন আমার বিশ্বাস। আর তাই কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে কবিতাপাক্ষিক তথা প্রভাতদা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
আমার পড়া প্রভাতদার প্রথম বই 'লাবণ্য একি লাবণ্য 'সেখান থেকে যে কথাগুলোকে জীবনের ধ্রুব করে নিয়েছি সেগুলো তুলে ধরলাম --
এক) প্রতি যুগের কবির তাঁর আগের কবির ছাঁচ ভেঙে ফেলাটাই প্রাথমিক কাজ। তারপর তাঁর নিজস্ব একটা সাঁচ তৈরি করা দরকার ।
দুই)একজন কবিকে তাঁর সমসময় থেকে কিছুটা বা চল্লিশ /পঞ্চাশ বছর এগিয়ে থাকতে হবে।
তিন) পরিকল্পনা গ্রহণ করে কবিতা লেখা উচিত।
চার) লাবণ্যহীন কবিতা বলে কোন শব্দবন্ধ নন্দনতত্ত্বে নেই ।
পাঁচ)ইউরোপ কিংবা আমেরিকার অনুকরণ নয় নতুন এক ভাষ্য তৈরি করতে হবে ।বাংলা কবিতার এখানেই ভবিষ্যৎ।
প্রভাতদার লেখা সম্পর্কে আলোকপাত করার ধৃষ্ঠতা আমার নেই ।কেবল যে যে বই গুলো পড়েছি সেগুলো থেকে নিজস্ব অনুভূতিটুকু শেয়ার করতে পারি।'সাক্ষাৎকার', ' আবার সাক্ষাৎকার ',নোট বই, পুর্বাহ্নের কবিতা ,সুন্দরবন ও অন্যান্য কবিতা ,সুসমাচার এবং ,যখন পড়ে শেষ করেছি কেমন একটা ঘোর যেন আমাকে গ্রাস করেছে ।সারা দিন রাত জেগে থাকার মুহূর্ত এবং কোন সময় ঘুমের মধ্যেও আমি ঘোড়ার কাঠের পা দেখতে শুরু করেছিলাম। লিখতে পারছিলাম না কিছু। যা লিখি, লেখার শেষে মনে হয় প্রভাতদার কবিতার অন্ধ অনুকরণ। অনেকে আমার কবিতা পড়ে সরাসরি মন্তব্য করা শুরু করলেন -- এগুলো তো পুরো প্রভাতদার স্টাইল ! তাঁদের কেমন করে বোঝাই ,এমন লেখা ইচ্ছাকৃত নয় !নিরুপায় হয়ে আমি প্রভাতদাকেই ফোন করলাম ।শরণাপন্ন হলাম প্রভাতদারই ।তিনি যা বললেন, তা আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করি।---" যে কোন বই পড়ার পর আমাদের রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হবে তারপর কিছুদিন বিরতি নিয়ে কলম ধরতে হবে তাহলেই সব সমস্যা মিটে যাবে"। অন্য কেউ হলে অনুগামী তৈরি হচ্ছেন জেনে খুশি হতেন হয়তো। প্রভাতদা বরাবর চান আনুগত্য নয়, ভালো লেখা উঠে আসুক।
আজ যতটুকু পরিচিতি আমি পেয়েছি তা প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অযোগবাহ বর্ণ' -এর জন্য ।কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কবিতাপাক্ষিক থেকে ।বইটির কবিতা নির্বাচন থেকে নামকরণ, প্রচ্ছদ সবটাই প্রায় প্রভাতদার। প্রভাতদা ভরসা না দিলে বই করার সাহস আমার হত না। আমি জানি এমন সাহস দিয়ে বহু তরুণ কবিকে তিনি বাংলা কবিতার জগতে পরিচিতি দিয়ে চলেছেন ,অথচ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে সেই কৃতজ্ঞতা টুকুও নিতে তিনি নিমরাজি ।বরং পারলে রেগে গিয়ে আরও একটা ধমক দিয়ে দেবেন।

প্রভাতদার একটি বিশেষ গুণ, তিনি বিনা কারণে পিঠ চাপড়াতে পারেন না। লেখা ভালো হলে যেমন সামনেই প্রশংসা করেন তেমনি ভালো না লাগলে মুখের উপর বলে দেন -এই লেখা চলবে না।
কবিতাপাক্ষিক আর প্রভাত চৌধুরী যেন জোড়কলম মহীরুহ। আমাদের মতো বাংলা ভাষার বহু শব্দচাষী এবং চারাগাছ এই জোড়কলম মহীরুহের ছায়ায় নিজেদের প্রতিনিয়ত তৈরি করার সুযোগ পাচ্ছে নিজস্ব পথে।কবি হিসেবে তিনি যে বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছেন ,একথা যেমন বাংলা কবিতার পাঠক মাত্র স্বীকার করবেন তেমনি প্রভাত চৌধুরীর নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি অ্যাবস্ট্রাক্ট নাউন সকলের চোখের সামনে ভেসে উঠবেই---নাউনটি 'কবিতাপাক্ষিক'। 
নানা কাজের ঝামেলায় ব্যস্ততম দিনগুলো কেমন ভাবে কেটে যায় নিজেও হয়তো মনে রাখি না। বছরের বিশেষ দিনগুলো ছাড়া কিংবা প্রয়োজন ছাড়া প্রভাতদাকে ফোন করাও তেমন ভাবে হয়ে ওঠে না। অনেক সময় ইচ্ছে করেও ফোন করি না ,জানি একটা ছকবাঁধা জীবনে তিনি চলেন ।এমন করেই গড়িয়ে যাচ্ছিল দিনগুলো ,কিন্তু কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটি পোস্টে দেখলাম -প্রভাত দা অসুস্থ ।ঠিক তখন থেকে মনের যে উদ্বেগ শুরু হলো, তাতে বুঝতে পারলাম প্রভাতদা আমাদের জীবনে কতটা প্রাসঙ্গিক ।কেবলই মনে হচ্ছিল ছুটে যাই। কাছে গিয়ে একটু বসি ।অসুস্থতার এতগুলো দিন পেরিয়ে যাবার পরও 'কবিতা উৎসবে 'ডাক পাওয়ায় কলকাতার টিকিট কেটে প্রভাতদাকে জানিয়েছিলাম ।তারপর মাঝে বিশ -পঁচিশ দিন কোনও ফোন করিনি ।অথচ ঠিক চব্বিশ তারিখ প্রভাতদার ফোন ।আমি তখন কলকাতায় নেমেছি মাত্র। যথারীতি নির্দেশ -বাড়িতে চলে এসো। বাড়িতে গিয়ে কোনদিন খালি মুখে ফিরে আসতে পারিনি আমরা ।শিয়ালদা স্টেশন থেকে প্রভাতদার বাড়ি হাঁটাপথ হওয়ায় প্রায় সময়ই রাতের খাওয়াটা ওখানেই খেয়ে গাড়িতে উঠি এটাই প্রভাতদা এবং বৌদি দুজনেই প্রত্যাশা করেন। সঙ্গে থাকবে গাড়িতে ওঠা থেকে শুরু করে বাড়িতে ঠিকঠাক পৌঁছানোর পর ফোন করার নির্দেশ। প্রায় সময়ই বাড়িতে পৌঁছানোর পরপরই আমরা ফোন করার আগেই প্রভাতদার ফোন চলে আসে ।ঠিক ঠাক পৌঁছে গেছি শুনে যেন কত নিশ্চিন্ত হলেন। এইরকম ভালবাসার বাঁধনে বেঁধে রেখেছেন তিনি সবাইকে। এত ব্যস্ত মানুষ আমাদের মত মানুষের জন্য যে এতটা সময় নির্দ্বিধায় নষ্ট করে দেন, তা আমাদের জীবনের পরম প্রাপ্তি বলেই মনে করি।

আফজলদার মাধ্যমেই পরিচয় হয়েছিল প্রভাতদার সঙ্গে ,তারপর এতগুলো বছরে কেমন করে যে কবিতাপাক্ষিক এর প্রতিটি মানুষ নিজের হয়ে গেছেন জানি না ।নাসের দা, গৌরাঙ্গদাকেও ইতোমধ্যে হারিয়েছি আমরা। প্রভাতদার শারীরিক অসুস্থতার জন্য কবিতাপাক্ষিক আর প্রকাশিত হচ্ছে না এই মুহূর্তে।আমার মতো বহু অক্ষরপাগল মানুষ তবুও আশাবাদী।প্রভাতদার সুস্থ ও দীর্ঘ কাব্যজীবন প্রত্যাশা করি।

Monday, June 21, 2021

ইন্দ্রাবতীর ডায়েরি থেকে

মনোনীতা চক্রবর্তী


এত মুড স্যুয়িং কেন? অবিন্যস্ত এই দোলনা জানে কি যতটা এগিয়ে যাওয়া তারচেয়েও বেশি পিছিয়ে যাওয়ার প্রবাহ আলোকলতা জড়িয়ে কেবল হাওয়ার শিকল গড়ে আর ভাঙে!
এত দহন-দহন  অবেলা কেন?
রহমত করো, বেলাশেষে গান ধরুক স্থির চোখের সেই শিল্পী; যার নামে আগুন বৃষ্টিডানা মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে খুব আদরে; মনে মন মেখে...
এত হিংসে কেন? রাস্তা তো সকলের। যার যেমন পথরেখা ছবি আঁকে; গান আঁকে, কথা আঁকে! আর এই কথা আঁকতে-আঁকতে সে অনায়াস সামলে নেয় মঞ্চ অথবা ঝাপসা দৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া চোখের অভিমানকে এক মুহূর্তের হাসিতে মুড়ে দিব্যি পড়ে ফেলে সেই ঝাপসা অক্ষর! রাস্তা কারও নয়; অথবা সবার। তোমাদের আলো, হাওয়া সবটুকু তো আমাদেরও। মিউট মোডে আলো পাক খায় মধ্যরাতে; হাওয়া এসে উড়িয়ে দেয় দৃশ্য। এনার্জি সেভ করো, মঞ্জরী; সঞ্চয় একটা প্রবীণ-বেলার লাঠি। নিজেকে হিল করো, মঞ্জরী! তিতির ডেকে উঠলে চোখ-কান খোলা রেখো; আজান আর মোরগের ডাক ইন্দ্রাবতীর আহিরে গলা মেলাবে; নিজেকে উঁচু দেখাতে অন্যকে নামিয়ে আনার ভিতর থেকে যায় শুধু শিশুসুলভ একটা দূর্বা রঙের নরম দুপুর; মঞ্জরী, শুভ্রকে বলে দিও যে ইন্দ্রাবতী এখনও সেই 'দূর্বা-রং' মুছতে পারেনি; কিছু সাদা পাতা আজও ইন্দ্রাবতী ছেড়ে রেখে দিল...

Tuesday, October 27, 2020

 খিদে যখন বেড়ে উঠে পরিপূর্ণ রূপ পেতে চায়

শ্রীহরি দত্ত 




খিদেই পায় আমাদের, মাতৃগর্ভ থেকে খিদে পায় আমাদের। জন্মের পর প্রথম চিৎকারে মাকে খুঁজে পেতে যে হাত দুটি ছুঁড়ে দিই, খিদের খোঁজ থাকে তাতে। যত বড় হই ততই খিদে পায়, যত ছুটে বেড়াই ততই খিদে বাড়ে, মায়ের কাছ থেকে যতই দূরত্বে থাকি না কেনো, যতই থাকি কোনো না কোনো আড্ডায়, পেটে যখন টান তৈরি হয়, ফিরে আসি মায়ের কাছে... খিদের জন্যে। এই ভাবেই ঘরের ভেতর তৈরি হয় খাবার সংগ্রহের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। ধীরে ধীরে চিৎকার বড় হতে থাকে, একদিন ঘরে বসেই শুনতে পাই খাদ্যের জন্যে আন্দোলনের স্লোগান ... মনটা কেমন করে ওঠে, তার মানে মাথা বুঝে নিতে চায় আমাদের প্রত্যেকের খাবার কি কেউ নিয়ন্ত্রণ করে? ...আর সেটা বুঝতে গিয়ে কখন যে ওদের দলে মিশে গেছি, তা বুঝে উঠতেই... খিদে কখন পেটের থেকে মাথায় উঠে বোধের জন্ম নিয়েছে, বুঝতেই পারিনি। এখন মনের খিদে পায়, মাথার খিদে পায়। তার থেকে মনে জন্ম নেয় ছবি। আঁকিবুকি টানতে টানতেই ছবি আমাকে তলিয়ে দিয়েছে তার খেয়ালে, তা বুঝে গেছে মন... এখন মন কেমন করার পালা... তার থেকে পরিত্রাণ পেতে রোজই এই মন ছবি আঁকে, আঁকলে খিদে মেটে। কিন্তু সেই পেট ভরার মতো খিদেরা একইরকম, আবার পায়। এখানে ছবির চিৎকার আরও গভীর... বুঝতে শিখেছে মন। কিন্তু মাথা বুঝতে শিখেছে যে সাহিত্যে খিদে অনেক আগেই এসেছে তাই তখন মাথা... রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, অরুণেশ, শক্তি, সুনীল পড়ে, সমস্ত শিল্পীর কাজ দেখে, খিদের পরিসর বাড়তে থাকে। একই সাথে জন্ম নিতে থাকে শরীরের খিদে ... সে তো আরেক মোচড়। যেন সব কিছুর উর্দ্ধে উঠে ভাবনার দেশে উন্মুক্ত বাতাস। চোখ বলে ধরে দেখ, জিভ বলে চেখে, হাত বলে উল্টে দেখ নিজ পরিসরে; কিন্তু সব কিছুতেই মানা। চুরি করে খাওয়ার স্বভাব, বাইরে চোখ রাঙায় যে মন, ভেতরে সিদ কাটে। কিন্তু খিদে বাড়তে বাড়তে চোখ তৈরি করে সে খিদে মেটানোর চেষ্টা আজও জারি রেখেছে।


এই খিদেকে বুঝতে গিয়ে কত মানুষ নিজেকে হারিয়েছে। ছুটে গেছে ভাতের কাছে... নদীর কাছে... প্রেমিকের কাছে... প্রকৃতির কাছে। শুধু নিজেকে পরিপূর্ণ করতে। খিদে কী, কেন, কোথায় পায়, মানুষ ভেদে খিদে কেমন, তার কি কোনো পার্থক্য আছে... প্রয়োজন বুঝতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যে ক্ষুধার আন্দোলনের জন্ম হয়ে সাহিত্যে নতুন ভাষা খোঁজার চেস্টা হয়েছে। ছবি আন্দলনের ক্ষেত্রেও বার বার সারা পৃথিবীব্যপী বিভিন্ন রূপ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে। ক্ষুধাকে নিয়ে শিল্পীদের বিভিন্ন চিত্র আমরা দেখতে পাই... বিভিন্ন শিল্পী, তাদেরই নিজস্ব ভাবধারায় যে শিল্প কর্ম করে থাকেন সেখানেও শিল্পী তার দর্শন তৃপ্তির সন্ধান করেন। আজও আমরা প্রতিদিন ছুটি সেই লক্ষ্যে, যেখানে চোখ... পেট... শরীর... মন... সমস্ত খিদের পরিপূর্ণতার জন্যে এই লক্ষ্যই একটি বিলীয়মান বিন্দুর মতো।

Monday, October 26, 2020

 

ক্ষিধে এক সমুদ্র পাখি...
সুবীর সরকার


ক্ষিধে এক সমুদ্র পাখি যে অনেক জলোস্তম্ভ পেরিয়ে যেতে চায়। ক্ষিধে আসলে সার্কাস তাঁবুর আলোর নিচে ঘন হতে থাকা অন্ধকার।
ক্ষিধে গড়াতে থাকে জীবনের নানা বাঁক ছুঁয়ে ছুঁয়ে।
কত রকমের ক্ষিধে। ভালোবাসার যৌনতার প্রেমের আশ্রয়ের আশ্রয়হীন তার। আপাত সুখী মানুষের ভেতরে পরতে পরতে সাজিয়ে রাখা ক্ষিধে ধারাভাষ্য হারিয়ে ফেলা এক দীর্ঘ পদযাত্রার মত।
সোমনাথ হোড় সালভাদর দালি অরি মিশো কর্পেন্টিয়ার পেরিয়ে যদি ঋত্বিক কিংবা প্রমথেশ বড়ুয়ায় আসি তবে দেখবো ক্ষিধে তো কেবল পেটের নয়!
মানুষের গোটা জীবনই তো নানারকম ক্ষিধে দিয়ে গড়ে তোলা বহুস্বরিক ভাষ্কর্যের মত।
রামকিঙ্কর বেইজের কথা মনে পড়ে যায়।
২.
ক্ষিধে আসলে ভাঙা হাট থেকে ভেসে আসা পদাবলী গানের আখর। গান শুনতে শুনতে এগিয়ে যাওয়া। অপেক্ষায় তো কেউ থাকে না আদতে। একটা ভাঙা লণ্ঠনের আলো খুঁজতে খুঁজতে রাতের জঙ্গলে ক্ষিধে খুঁজতে যাই। জীবনের পাকে পাকে ক্ষিধে এক মহামান্য শব্দবন্ধ হতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত কি আর তা হয়!
নদীর জলে মানুষ ভরা ফেরি নৌকো। একেক মানুষের মুখে একেক রকমের ক্ষিধে না ফুরিয়ে যাওয়া গল্পের মত বুঝি।
৩.
আবহমান যাপন ভূমির প্রস্থান রেখায় বারবার ভোরের আলোর সাথেই জেগে ওঠে আমাদের ক্ষিধে। মুলিবাশের বেড়ার ফাঁকে জলে ভিজিয়ে রাখা ভাত খেতে খেতে মহেশ্বর দাস তার ক্ষিধে জড়ানো আস্ত জীবনের কথা ভাবে। ভেবেই চলে। সে ভাত খেতে খেতে স্বপ্ন দেখে লাল মরিচ, কাসুন্দি আর পেয়াজের ঝাঁঝের।
নুরুদ্দিন ইয়াসিন নুর নবীরা তখন ফেলে আসা সময়ের বৃত্তে প্রবেশ কিংবা অন্তর্ধানের এক জলবিভাজিকা এই মরপৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে থাকে। আর গানের ঢেউয়ের পিঠে ক্ষিধে ও খুদকাতরতা কেবল ভেসেই যেতে থাকে_
" এ পাড় থাকি না যায় দেখা রে
   নদীর ওই পাড়ের কিনার"
৪.
ক্ষিধে নিয়ে অচিন্ত নন্দীর নির্মিত একটি তথ্যছবি দেখতে দেখতে আমি চলে গিয়েছিলাম ইথিওপিয়া আফ্রিকা সোমালিয়া কলাহান্ডিতে। সত্যি, ক্ষিধে কি প্রবল এক বিপণন! হাড্ডিসার শরীর নিয়ে কলো মানুষেরা কিন্তু হারতে চায় না। তারা হারে না।পরাজয় থেকে ঢের দূরে দাঁড়িয়ে তারা লোকসঙ্গীত গায়। ধুঁকতে ধুঁকতে নাচে। জীবনের দিকে তীব্র ব্যঙ্গ ছুড়ে দিয়ে ক্ষিধে তখন আবহমানতার দিকে গড়াতে থাকা কবেকার সেই কাঠের বন্দুক। সিন্ধু সভ্যতার লো ল্যান্ড।
৫.
ক্ষিধে নিয়ে কিছু চিরকালীন সামগান তো টেনে আনা যেতেই পারে! হাংরি অ্যাংরি হিপি বিট থেকে ক্ষিধে ক্রমে সমকাল অতিক্রম করে করে চিরদিনের সম্পদের মত অ্যান্টিক কিছু বুঝি বা!
ক্ষিধে আলাদা করে তেমন কিছুই না।
ক্ষিধে আছে বলেই তো আমাদের সভ্যতা গড়ে ওঠে। সভ্য মানুষেরা ঝুঁকে পড়ে শিল্প সাহিত্য গান প্রেম যৌনতায়।
ক্ষিধে শেষপর্যন্ত আদি ও অন্ত এক কুটিরশিল্প, যা বেসিক্যালি সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়তে চাওয়া প্রবল এক প্রতিরক্ষার মত!

 রাখাল কিংবা ক্ষুধাবিষয়ক রচনা

প্রশান্ত গুহমজুমদার



আমি রাখাল। সীমা আর শংকু-কে নিয়ে আমার ছোট্ট সংসার। কিছুদিন ধরেই ভাবছি আপনাদের একটা গল্প শোনাবো। মানে শোনাতে চাইছিলাম। বিশ্বাস করুন, গল্পটা ছিল একটা বাঁশের সেতু, দুটো ছাগল আর কয়েকটি গাছের গল্প। সেখানে এক অতীব সুন্দরী, সামান্য মেঘ আর ঝরা পাতার শব্দ। 

কিন্তু লেখাটা হয়ে দাঁড়াল এ রকম। সরি। সীমা বা আমার কোন খরিদ্দারকে এসব বলা যায় না। পাগলও ভাবতে পারে। তাই আর সাহস করি নি। আসলে বিষয়টা  সারা পৃথিবী বা মানুষের খিদে নিয়ে বিদ্যালয় কিংবা মহাবিদ্যালয় উপযুক্ত এক সামান্য রচনা।

এটা যে কোন জায়গা থেকেই শুরু করা যাতে পারে। যেমন রমেনের কথা দিয়ে।

রমেন, আমার একদা সহপাঠী, সেই বিরল বাঙ্গালীদের মধ্যে একজন যে কথায় কথায় একদিন আমাকে জানিয়েছিল, কিছু জিনিস নিয়ে ও ভাবার প্রয়োজন বোধ করে না। যেমন, খাবার, মাথা গোঁজার আস্তানা, বিনোদনের বৈচিত্র এবং ভ্রমণের অর্থ। তার বহুজাতিক সংস্থার ৩০ শতাংশ মালিকানা, পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত নিজেদের গুটি কয়েক বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা এবং সুবিশাল চমকদার বাড়ি। সে দেশবিদেশ ঘোরে, মহার্ঘ্য মদ্য পান করে, নারী সংসর্গে বড়ই উন্নাসিক এবং পটু। তিনটে মূল্যবান গাড়ির একটা নিয়ে অফিস, ব্যবসা দেখে, একটা গাড়ি বিনোদনের জন্য আর একটি দেশের বিভিন্ন রিসর্টে যাওয়ার জন্য বরাদ্দ। সে খাবার, মাথা গোঁজার আস্তানা এমন কয়েকটি জিনিস বোঝে না বা সে সব দিকে ধ্যান দেওয়া সময়ের অপব্যয় বলেই মনে করে।

ব্যক্তিগতভাবে খিদে নিয়ে আমার কিন্তু খুব মাথাব্যথা নেই। দৈনন্দিন মাথাব্যথার মত। ঘিনঘিনে একটা ব্যথা লেগেই থাকে। খিদে পেলেও ব্যথা, মাথা ধরলেও ব্যথা। সে আমার সহ্য হয়ে গিয়েছে। আমার ছোট একটা শোপিসের দোকান আছে। ঘর থেকে অনেকটা দূর। সকালে ৮টা নাগাদ দুটো ভেজা ভাত খেয়ে বেড়োই। ফিরি রাত্রি ৯টা নাগাদ। দুপুরে টিফিন বক্সে বৌয়ের দেওয়া একটু ভাত, ডাল আর সবজি। কোন কোনদিন এক টুকরো পোনা মাছ। অতএব খিদে আমার আছেই। অন্য কোন খিদের বাতিক আমার নেই। 

রমেন-কে আমার কোন ঈর্ষা নেই। যার যেমন কপাল। কেউ শোষণ করে, কেউ বা কেবল শোষিত হয়েই চলে। আমার মা তো শৈশবেই রওনা দিয়েছিলেন। বাবাও ফটাং করে পাঁচ দিনের জ্বরে গন্‌। ভাগ্যিস ভাই বোন কেউ ছিল না আমার। তখন বয়স কত হবে আমার! সতেরো-আঠারো। সেই থেকে খিদে আমার নিত্য সঙ্গী। এক দূর সম্পর্কের কাকার পরামর্শে লটারির ব্যবসা, অফিসে অফিসে স্টেশনারী মাল সাপ্লাই দেওয়ার কাজ। তবে এর মধ্যেই গ্র্যাজুয়েশনটা করে নিয়েছিলাম। মাথাটা খুব খারাপ ছিল না। ভুগোলে অনার্সটাও ছিল। কিন্তু তাতে কী আর চাকরি জোটে! এই সব করতে করতেই কালেক্টরেটের এক সাহেবের নজরে পড়ে যাই। এই আট বাই আট ঘরটা তাঁরই অবদান। একটা ছোট্ট মার্কেটের মত যায়গায় দোকানটা। সেই শুরু। তা আজ বাইশ বছর হয়ে গেল। তবে দারিদ্র সীমার উপরে ওঠা আমার এখনো হল না। লিস্টে দেখেছি, জ্বলজ্বল করছে আমার আর সীমার নাম। দেশের বাইশ শতাংশ মানুষের মধ্যে আমরাও তা হলে আছি! বেশ একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়। দোকানে বিক্রিবাটা কিছু হয়। তবে সবই চায়না মাল। এর মধ্যেই বিয়েও করলাম। শংকু এলো। ওর এখন চার। আমাদের  গড় ওজন আশি। 

দুটো দোকান পরেই অনিলের বড় মুদিখানা-কাম-স্টেশনারি দোকান। আমারই বয়সী। পড়াশোনাও প্রায় আমারই মত। তবে বি পি এলে নেই। কোন দেখনদারীও নেই। নানান বিষয়ে খোঁজখবর রাখে, পড়াশোনা করে। মাঝে মধ্যে আমার কাছে এসে বসে। আমরা সামনের চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। ওকেই প্রথম কথায় কথায় এই খিদে আর পেটের ব্যথার গল্প করেছিলাম। সেদিন চায়ের সঙ্গে দুপিস্‌ পাঁউরুটি মাখন আর চিনি মাখিয়ে খাইয়েছিল। ব্যথাটাও গায়েব। 

এরকমই এক দুপুরে অনিল আর আমি বসেছি। সামনে দিয়ে একটা বিরাট মিছিল। দু টাকায় চালগম, শাসকদলের বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে মিছিল। 

-এমন মিছিল তো হর সপ্তাহেই দেখছি। কিন্তু আমাদের তো কিছু হচ্ছে না! মানুষের খিদে কী কমছে? মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষের হয়রানি।

-এ ভাবে ভাবছো কেন? মানুষের দাবীদাওয়া অভাব অভিযোগ নিয়ে মানুষই তো কথা বলবে। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে, এ ধরনের বেশিরভাগ মিছিলের পিছনে কিছু রাজনৈতিক ফায়দার ব্যাপার থেকেই যায়। ফলে মিছিল হয় ঠিকই, কাজের কাজ কিছু হয় না।   শুদু তুমি নও, সারা পৃথিবী পেটের খিদেয় ভুগছে। 

বোধহয় অনিলের তাড়া ছিল না। পকেট থেকে দামী ফোন বের করে ক্ষুধা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান আর খবর দেখিয়েছিল। আমি তো হতবাক! 

তারপর থেকে সময় পেলেই ওকে খোঁচাই। হাসতে হাসতে ও কত কিছু যে জানিয়েছে আমাকে! অনিলকে রমেনের কথা বলেছিলাম। ও কোন কথা না বলে একটার পর একটা ভয়ংকর অবস্থার কথা বলেছিল। 

বলেছিল, রমেনের মত ওই ২০% বা ৩০% মানুষ অনায়াসে অবহেলায় সারা বছরে যে পরিমান খাদ্য অপচয় করে বা করার স্পর্ধা করতে পারে, তার পরিমাণ বছরে উৎপাদিত  খাদ্যশস্যের ৪০% । অর্থের নিরিখে তার মূল্য ৯২ হাজার কোটি টাকা।  আমাদের দেশে এত প্রগতির আলো চারপাশে বিচ্ছুরিত হলেও সাম্প্রতিক সুমারির হিসেব অনুযায়ী ২২% মানুষ বিপিএল তালিকায় এখনো রয়ে গিয়েছে। ২০১৭-র গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স রিপোর্ট অনুযায়ী ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারত ১০০তম স্থানে অবস্থান করছে। খুব অবাক করে দেওয়ার মত ঘটনা, ইরাক, বাংলাদেশ, নর্থ কোরিয়ার থেকেও ভারত এ ব্যপারে পিছিয়ে রয়েছে। যথেষ্ট পরিমানে খাদ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে ১৯০ মিলিয়ন মানুষ অভুক্ত থেকেই রাত্রে ঘুমোতে যায়। তথ্য অনুযায়ী ৪টি শিশুর মধ্যে একটি শিশু ভুগছে অপুষ্টিতে। ভারতে শিশুদের অবস্থা একবার ভাবতে পারছো? 

সে রাত্রে ঘরে ফিরে ঘুমন্ত অংশুর মাথায় হাতটা ছুঁইয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।  কিছু মুখে তুলতে পারি নি। 

তবু অনিল ক্রমশ আমার একটা নেশা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। দুপুরের চায়ের দোকানে বসে থাকার সময় দিনের পর দিন হচ্ছিল দীর্ঘতর । 

এরকমই একদিন অনিল বলছিল, তার নাকি মনে পড়ে ভ্যান গঘের 'পটেটো ইটারস'-ছবির কথা। ছবির প্রিন্ট আমিও দেখেছি। কিন্তু ডিসটার্ব করলাম না। অনিল বলে যাচ্ছিল। 

-কিশোরকবি সুকান্ত-র সেই বহুল পরিচিত পংক্তি আজ উচ্চারণ না করেও বলা যায়, এই পৃথিবীতে সামান্য কয়েকটি পরিবারের ব্যবসায়িক মূলধন যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ক্ষুধা, অনাহারে মৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে যেন সেই হারেই। ঝলসানো রুটিও জোটে না মানুষের কপালে আজো। এ এক বিচিত্র ফ্যালাসি! অথবা ধনতন্ত্রের স্বাভাবিক উপহার। সামান্য পুরনো কিছু তথ্য মনে রাখা যাক। সারা পৃথিবীর ৮১০ মিলিয়ন অর্ধভুক্ত অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে আমাদের শস্যশ্যামল ভারতের ১৯৪ মিলিয়ন মানুষ এসে গিয়েছেন এই বিবর্ন চিত্রপটে। অথচ আমাদের দেশ কতকগুলি খাদ্যসামগ্রীতে তো উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে রেখেছে। যেমন, দুধ, ডাল, বাজরা ইত্যাদি। ভারত চাল, গম, আখ, বাদাম, সব্জি, ফল আর তুলো উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তুমি হয়ত বলবে, তাহলে এমন অবস্থা কেন! দেশের অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল বা যাদের সাধারণ ভাবে যারা গরীব, প্রত্যন্ত গ্রামেরই তো মানুষ তাঁরা, তাঁদের কাছে তো পৌছচ্ছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার অথবা প্রয়োজনীয় খাবারটুকু কেনার ক্ষমতাই থাকছে না। কারণও অনেক। এইসব মানুষের কাছে পৌঁছাতে যে পরিকাঠামো প্রয়োজন, সেই রাস্তা, পরিবহনের ব্যবস্থা, কৃষক থেকে ক্রেতার কাছে সরাসরি খাদ্যদ্রব্য পৌঁছনোর মত ব্যবস্থা, সবই তো অধরা! এ ছাড়া রয়েছে ফড়েদের দৌরাত্ম। শেষ অবধি চাষীর পকেটে যায় সামান্যই। আর গরীব মানুষের কাছে, মনে রাখতে হবে কিন্তু  ঐ চাষীও একজন ক্রেতা, সেই খাদ্যদ্রব্য হয়ে যায় অগ্নিমূল্য। এদের পকেটে অত পয়সা কোথায়! ফলত ক্ষুধা থেকেই যায় পেটে। খাবারের নিরাপত্তার অভাবে এই শ্রেণীর মানুষ ভোগে আজীবন। অপুষ্টি হয়ে পড়ে এদের আজীবনের সঙ্গী। 

ক্রমশ বির্বাক হয়ে পড়ছিলাম। আর এ ভাবেই অনিল ক্রমশ ভুলিয়ে দিচ্ছিলো আমারই খিদে বোধ। 

একদিন বললো, চলো, কাল তো রোববার। একটা গ্রাম দেখে আসি। প্রশ্ন করি নি কোথায়, কেন। শুধু সময়টা জেনে নিয়েছিলাম। বাড়িতে ব'লে সময়মত দোকানের সামনে। তারপর ঘন্টা দেড়েকের বাসজার্নি, দুটো বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে হাঁটা, তারপরেও কয়েক কিলোমিটার। ক্রমে দেখা গেল ঘরের মত বেশ কিছু আস্তানা। চৈত্রের মাঝামাঝি। ঘন বসন্ত। অন্তত ক্যালেন্ডারমাফিক। এখানে সে সুবাতাস নেই। তীব্র দহন শুধু। কিছু মুরগী চরে বেড়াচ্ছে। একটা ঘরের সামনে তালপাতার চাটাই মতো একটা কিছুর উপর শুয়ে আছেন লোলচর্ম হাড়সার এক বৃদ্ধা। ভয় হয়, আর কোনদিন উঠে বসতেও পারবেন না। চোখদুটো আমাদের দিকে। ভাষা নেই কোনো সে চোখে। কিছু দূরে দুটি বালকবালিকা, দৃশ্যত শিশু। একে অপরকে জড়িয়ে। অদূরে একটি মেয়ে, মনে হয় আসন্নপ্রসবা। কোটরাগত চোখ, প্রবল রক্তাল্পতা। দৃশ্য শুধু তার পেট। বসে আছে দাওয়ায়। অবশ্য ওটাকে যদি দাওয়া বলা যায়। ব্যাগ থেকে নিজেদের জন্য আনা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে ওদের দেওয়ার জন্য এগোতেই অনিল আমার হাত চেপে ধরলো। 

- কক্ষনো এই ভুল কাজ করবে না। ওরা নেবে না। আর এভাবে ওদের না খেয়ে থাকার বহু দিনের, অভ্যাসের কী অবসান তুমি ঘটাতে পারবে? মাঝখান থেকে ওরা ভিখিরি হয়ে যাবে। না খেয়ে মরে যাওয়া নতুন কিছু নয় ওদের কাছে। ওরা জানে, মা বাবা ভিন দেশ থেকে ওদের জন্য নিয়ে আসবে খাওয়া। ঘরে এখনো থেকে যাওয়া খাদ্যের অবশিষ্ট ফুরিয়ে গেলে ওরা অপেক্ষা করবে। ওরা অপেক্ষা করতে শিখে গিয়েছে। 

-পুরুষ বা অন্য সব মেয়েদের দেখছি না তো!

-বললাম তো ওরা সবাই ভিন্‌ দেশে কাম্‌লার কাজ করতে গিয়েছে। ধান কাটা শেষ হলে ফিরে আসবে ঘরে। যে যেটুকু পারে নিয়ে আসবে ক্ষুধা নিবারণের অন্ন।

 - এখানে তো কোন যানবাহনের আসার মত কোন পথও দেখছি না!

-দেখবে না। নিজেই তো দেখলে, বাস থেকে নেমে কতটা হেঁটে এলাম এখানে। আর এই যে জমিটায় ওরা ঘর তুলেছে, সবটাই ব্রম্ভডাঙ্গা। এখানে কোন জলের ব্যবস্থা নেই। ফসল ফলে না। পানীয় জল পাঁচ ছ কিলোমিটার দূরে একটা সরকারী কুয়ো আছে, সেখান থেকে নিয়ে আসে। দু চারটে ফলের গাছ লাগিয়েছিল। বাঁচে নি।

-তুমি এত সব জানলে কী করে!

-যখন ওরা ফিরে আসে, সে সময়ে আসি। ওদের সঙ্গে গল্পগাছা করি। বেশি কিছু বয়ে আনার ক্ষমতা তো নেই আমার। ওদের জন্য বিড়ি সিগারেট আর কিছু গুড় বাতাসা চিনি নুন নিয়ে আসি। জানি, বিড়িটিড়ি আনা, এটাও ঠিক না। তবু আনি। ওদের পুরনো বন্ধু হিসেবেই আনি। ওরা আমাকে খেতে দেয় মোটা চালের ভাত, সবজি। আর হাঁড়িয়া। এ টুকুই তো ওদের বিনোদন।

আর কোন প্রশ্ন করি নি। মাথা নিচু করে ফিরে এসেছিলাম। 

এটুকু হচ্ছে দীর্ঘ এক রচনার সামান্য অংশ। আপনারা পরিত্রাণ চাইছেন, অনুমান করছি। ক্ষমা করবেন। আর সামান্য কয়েকটি কথা। 

দিনের পর দিন অনিলের কথা শুনতে শুনতে মনে হয়,  রমেনের মত মানুষকে হিসেবের বাইরে রাখলে অনিলের মত মানুষেরও হয়ত দেখা পাওয়া যায়, যারা কেবল খিদে বোঝে না, অপরের জন্য অনুভব করে, সাধ্যমত চেষ্টা করে দারিদ্র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, অন্তত শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে। এটুকুই ভরসার কথা। সর্বার্থেই ভারত এগোবেই একদিন, অনিলের মত মানুষের জন্যই উপরে দেওয়া সব খারাপ খারাপ তথ্য পাল্টে যাবে আগামীতে। আমাদের তিনজনের আর ক্ষিধে থাকবে না। ভয়ংকর এক প্যানডেমিকের মধ্যে দিয়ে এগোলেও, আমরা আশা করব, এ সবই সাময়িক। ৫ বছরের নিচে শিশুদের অপুষ্টিতে ভুগতে ভুগতে নানান অসুখে আর ঢলে পড়বে না মৃত্যুর কোলে, প্রতিদিন আমার এই প্রিয় জন্মভূমিতে ৩০০০ শিশু অপুষ্টিজনিত অসুখে হারিয়ে যাবে না চিরতরে মায়ের কোল থেকে, পেটের খিদে নিয়ে মানুষ প্রতি রাত্রে আর ঘুমোতে যাবে না সর্বহারার বিছানায়।


-


Saturday, July 25, 2020

ব্যক্তিগত গদ্য : সত্যম  ভট্টাচার্য 
একটি গোল পৃথিবীর গল্প
সত্যম ভট্টাচার্য


ঘটনা এক(ষাটের দশক)

কালো পিচ রাস্তার দুপাশে ঘন সবুজে ছাওয়া চা বাগান। তার মাঝে মাঝে গাছ। সেগুলো শেডট্রি। দূরে ফ্যাক্টরী দেখা যায়।সাদা ধোঁয়া ওঠে তার চিমনি দিয়ে।বাতাসে চায়ের গন্ধ ভাসে।ফ্যাক্টরী পেরিয়ে আরো দূরে ডানা মেলে দিয়ে থাকে সবুজ পাহাড়।মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হয় সেখানে আর বৃষ্টি হলেই সে পাহাড় যেন তার  সবটুকু নিয়ে চলে আসে আরো হাতের কাছে।কি বলতে চায় সে আসলে?এদিকে বাগানের  বুক চিরে চলে গেছে ট্রেনলাইন।কালো ধোঁয়া উড়িয়ে হুইসল বাজিয়ে সেখান দিয়ে চলে যায় ট্রেন।বাগান পেরিয়েই পাহাড়ি নদী। বর্ষাতে তার উথালপাতাল জল ।অন্যসময়ে সে নদী কিন্তু প্রায় খাঁ খাঁ করে।শীতে লোকজন নেমে যায় পিকনিকে।পুজোর সময় ঠাকুর ভাসান হয় ।ব্রিজ দিয়ে চারিদিক কাঁপিয়ে ঝমঝম করে চলে যায় ট্রেন।আর চা বাগানের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা সামান্য চড়াই নিয়ে চলে যায় বাগানের ভেতর দিয়ে পাহাড়ের দিকে।সে পথের দুপাশে আদিবাসী-নেপালী মহিলারা দল বেঁধে চা পাতা তোলে।ভাগ করে নেয় হাজার দুঃখের কথা চকচকে হাসিতে।হাজার কষ্টেও কিন্তু সে হাসি অমলিন থাকে বরাবর ।
ট্রাক্টরে করে সে বাগান থেকে অনেকের সাথে পাশের গঞ্জের স্কুলে পড়তে যেতো দুই বোন,সাথে থাকতো ছোট একটি ভাই।তাদের মা নেই।অনেকদিনই তাদের খাওয়া হোতো না সকালে,সেভাবেই স্কুল।  দিদিমণিরা জানতে পারলে তাদের ডেকে নিয়ে খাওয়াতেন টিফিন বেলায়।এরপর স্কুল শেষ হলে ফেরার পালা,দাঁড়িয়ে থাকে তারা কোনো জায়গায় একসাথে।তারপর কোনোদিন হাঁটতে হাঁটতে ,কোনোদিন আবার পাথর বোঝাই ট্রাকে করেই তাদের ফিরতে হয়।
দিন কাটে, সময় যায়।দেখতে দেখতে একসময় সেই দুই বোন সবুজ চা বাগানের মায়া কাটিয়ে নতুন বন্ধনে বাঁধা পড়ে চলে আসে শহরে।কিন্তু স্মৃতিদের ভিড়ে কখোনো কি একা থাকা যায়?(নচিকেতা)।তাই তাদের কথায় উঠে আসে সেই গঞ্জের বিভিন্ন জায়গার নাম,তাদের স্কুল, দিদিমণিরা,সেই সবুজে ছাওয়া চা বাগান,রাতের অন্ধকারে পাহাড় থেকে নেমে আসা হাতির পাল অথবা বাঘের ডাকে ঘুম ভেঙে কাটানো বিনিদ্র রাত।

লং শট(ক্যামেরা প্যান)
ঘটনা দুই(নব্বই দশক)

মফস্বল থেকে একটি ছেলে পড়তে আসে শহরের স্কুলে।ব্যস্ত রাস্তায় নদীর ওপরের ব্রীজ পেরিয়ে সে একমনে হাঁটে স্কুলের দিকে।আর লোকজন ভিড় পেরিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তার লাজুক চোখ খুঁজে নেয় এক শ্যামলা বর্ণের কমলা স্কার্টকে।একবার দেখেই চোখ নামিয়ে নেয়।বিনুনি দুলিয়ে পিঠে ব্যাগ নিয়ে সেও হাঁটে স্কুলের দিকে।কাছেই থাকে।ছেলেটি চেনে তার বাড়ি। যেতে আসতে দেখেছে ।সে দেখে সকালের মিঠে রোদ কি মোহময় হয়ে ওঠে সেই কমলা স্কার্টে লেগে।আহা রোদ্দুর কি মিঠে আর নরম হয়ে তখন নেমে আসে শহরের বুকে।ব্রীজের ওপরের প্রতিদিনের যানজটকে তার তখন আর কোন কিছুই মনে হয় না।সে সব যেন ফানুস হয়ে উড়ে যায় আকাশে।মুখোমুখি তখন ব্রীজ পেরোয় সেই বালক আর কমলা স্কার্ট।
এখানেও দিন যায়,সময় কাটে।আর সময়ের সাথে সাথে যে জল বয়ে যেত ব্রীজের নীচের নদীতে, তাতে ভেসে ভেসে আলাদা হয়ে যায় সেই ছেলেটি আর কমলা স্কার্ট।কার যে ঠিকানা লেখা হয় কোথায় কে জানে।
আবার কয়েক বছর পর কিভাবে জানি তাদের দেখা হয়ে যায় শহরের কলেজে।এবারে একই বিষয়ে স্নাতক।ছেলেটি অবাক হয়ে যায়।তার মানে এতদিন যাকে সে দেখেছে ব্রীজের ওপর,সেও তার সাথে একই ক্লাসে পড়ে।তখনও গ্রাম থেকে শহরে পড়তে আসে সে-গোবেচারা,খানিক লাজুক।ওদিকে মেয়েটি কিন্তু বেশ ডাকাবুকো।ছাত্র রাজনীতিতে কলেজে তার বেশ নামডাক।এবারে দুজনের খানিক কথা হয় বটে,সহপাঠী তারা।কিন্তু বন্ধুত্ব টাইপের কিছু হয় না তাদের দুজনের মধ্যে।

লং শট
জীবন গিয়াছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার

ততদিনে সত্যিই কুড়িটি বছর বাদ চলে গিয়েছে জীবনের খাতা থেকে।ছেলেটি হরিপদ কেরানী হয়ে গেলেও সে কিন্তু তোরঙ্গ থেকে মাঝেমাঝেই খুঁজে   বের করে তার পুরোনো প্রিয় জিনিসগুলো।তার মায়ের বেড়ে ওঠার চা-বাগান,পুরোনো স্কুল ,সেই গঞ্জ যা এতদিনে আর গঞ্জ নেই,হয়ে গিয়েছে ঝকঝকে মহকুমা শহর।মাঝেমাঝেই সে গিয়ে দাঁড়ায় সেই শহরে।বড় প্রিয় জায়গা তার এটি।কত ধর্ম-বর্ণ-ভাষাভাষীর মানুষ একসাথে মিলে বাস করে এই শহরে।যেন এটিই প্রকৃত ভারত।এক অদ্ভুত আকর্ষণ তার কাছে এই শহরের।তার মা-বাবাও জন্মের পর তাকে নিয়ে থাকতে এসেছিলো এখানেই।

ক্যামেরা প্যান

নিঝুম জৈষ্ঠ্যের দুপুরে ঘু ঘু ডেকে যায় অবিরত।হরিপদ কেরানী শহরের এক চিলতে ফ্ল্যাটে শুয়ে শুয়ে ভাবে তার পুরোনো গ্রামের বাড়ির কথা।কিভাবে সেখানে বিকেল নামতো আর তা পেরিয়ে সন্ধ্যে হতেই হাজার জোনাকী জ্বলে উঠতো চারিদিকে।সে ভাবে এরকম সময়েই তার মা বান্ধবীদের সাথে স্কুল থেকে চা বাগানের মধ্য দিয়ে বাড়ির পথ ধরতো।এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাত তার মুখবইয়ে ভেসে ওঠে শহরের সেই মেয়েটির মুখ।কুড়ি বছর পেরিয়ে সে এখন দেখতে একদমই অন্যরকম হয়ে গিয়েছে।কিন্তু চোখ,চোখ তো সেই একই রয়ে গিয়েছে। হরিপদ কেরানি মুখবই হাতড়ে দেখে সে সুন্দর গান শোনাচ্ছে সেখানে বসে ।অনেক ভেবেচিন্তে হরিপদ কেরানী বন্ধুত্বের ডাক পাঠায়।পারবে কি তাকে চিনতে সে মেয়ে?আশা নিরাশার দোলাচলে কাটতে থাকে সময়।একসময় সে মেয়ে গ্রহণ করে বন্ধুত্বের ডাক।কথা হয় তাদের।মেয়েটি এখন সেই গঞ্জের স্কুলের দিদিমণি,স্কুল কোয়াটার্সেই তার সংসার।হরিপদ কেরানী আরেকবার পেয়ে যায় আরেক পুরোনো তোরঙ্গের হদিস।বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে ভাবে  জীবন কি এরকমই জুড়ে থাকার গল্প?


একটি ব্যক্তিগত গদ্য ও নিশিযাপন
বিকাশ দাস(বিল্টু)


এখন মাঝরাত। মাথার ওপরে চাঁদ। মেঘ-ছায়া, আলো-ছায়ার লুকোচুরি খেলা চলছে। আকাশে। মননে। আমি চুপটি করে বসে বাড়ির সামনে। আমাদের খলানে। 

এখানেই বাবা বাজার থেকে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে কিংবা কোনোদিন না খেয়েই আনমনে গভীর রাত অব্দি বসে থাকতেন। একাই। কি জানি কি ভাবতেন তন্ময় হয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা। কি ভাবতেন? কেন বসতেন? কি দেখতেন? জানিনা! 

  যদিও এখন অনেকটাই বুঝেছি বাবা কেন এভাবে কাটিয়ে দিতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। বিড়ি শেষ না হতেই কেন আবার ধরাতেন বিড়ি। বিড়ির পর বিড়ি।

নিস্তব্ধতার বেড়া জাল ডিঙিয়ে একটি হুইসেল আমার চেতনায় আঘাত হানে। থেমে গেলাম কিছুক্ষন।

   মাঠে চাষ করা ট্রাক্টরটি লাল আলো জ্বালিয়ে পাশ কেটে গেল আমার। আমায় ডিঙিয়ে বাঁশেরমাচা লাগোয়া পথটি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে বড়ো রাস্তার পথে। ক্রমে আড়াল হচ্ছে আলো। 

        ততক্ষনে বিষাদের কপালে লেপে দিল চাঁদের আলো। ধানখেতের জলে উপচে পড়ছে রূপালী চাঁদ। কেঁপে কেঁপে উঠছে সে আলো। ধরলার বাতাস চুম্বন করছে আমায়। কাদামাটির সোঁদা ঘ্রাণে বিভোর হয়ে মায়াবী সংসারের মায়ায় আরও জড়িয়ে পড়ছি অধিকতর গাঢ় হয়ে।

     চাঁদ এখন মেঘের আড়ালে। ঘরে ফেরার পালা। মা ডেকেই চলছেন : ' বাবা ঘরে আয়। আর কত!'

যদিও তখনও মৃদু বাতাসে কেঁপেই চলছে আমার হাতে বপন করা সদ্য ধানের চারা।