Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts
Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts

Friday, January 8, 2021

 

শেষ না শুরু
অনিমেষ

গদ্য লিখতে বসলে সর্বপ্রথম যেটা আমাকে আকর্ষণ করে সেটা হলো আমি কিছু কিছু সময় যেভাবে বিষয়হীন ভাবে ছেড়ে দিই নিজেকে ।কী লিখছি কেন লিখছি কোন দিকে যাচ্ছে লেখা সেরকমই সেই নেশাটা আমাকে টেনে নিয়ে যায়। গদ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করতে না পারলেও হয়তো পাতা ছুঁয়ে বেরিয়ে আসি ঈষৎ।

শহরের মাথার উপর চাঁদ জ্বলে আছে দীর্ঘদিন ,নিস্তার নেই তার। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে।শীত বাড়ছে ।শীতল মেঘে ঢাকা পড়ছে চাঁদ। এরপর সমস্তটা রাতের মতো নির্ঝঞ্ঝাট। অথচ দেয়াল ঘড়ির মতো তীক্ষ্ণ বীতশ্রদ্ধ কী আছে আর!

কুয়াশার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে জলপাই ফলের গাছ। পড়ে আছে ঝুলে আছে ফল। তুলে নেবো কি নেবো না ,ভেতর ভেতর অন্তর্দাহ শুরু হয়েছে। যাদের মুখ না দেখার মতো করে রাস্তায় পাশ কাটিয়ে চলে যাই।সেরকমই আর না থেকে এগিয়ে যাই। ট্রেইন চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে।হাঁটার মুহূর্তগুলো সকালের বাজার, ভায়োলিন ছেড়ে আসা মেয়ে ,গভীর রাতের কফি সব আদতে একটা একটা দৃশ্য ঢুকে পড়তে থাকে স্মৃতির ওয়্যারে।

থমকে যাই। যেভাবে এতকাল বেকার থেকে থেকে ভুলে গেছি কখন কোথায় কী বলতে হয়। আদতে নাব্যতার সামনে বরাবর চুপ থেকেছি চুড়ান্ত চুপ। মুখে কুলুপ। বহিদৃশ্যের সাথে অন্তর্দৃশ্যের একটা পার্থক্য থাকে ছায়াবলয় ঘিরে চলতে থাকে ঠান্ডাযুদ্ধ। A amazing cold war .

মাঝেমধ্যে  শূন্যতার সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে অতলান্তে তলিয়ে যাই। তল্লাশি চলে চলতে থাকে। মৃত্যু ঠিক কোথায় লেখা!কোন দরজার সামনে দাঁড়ালে এক্স ফ্যাক্টর কাজ করে যাবে।  Terrific luck খেলে যাবে।

এই একটা গদ্য লেখার সমস্যা । মেমোরির ধার ঘেঁষে কিছু আলো তুলে নেবো ভাবি তা আর হয়না। টাইম ট্রাভেলিং করতে করতে পৌছোই ছেড়ে আসা জগতে। Thw worthless memories.

তবুও হাঁটি যেভাবে আকর্ষিত হয়ে থাকি অনর্থক কোনো গদ্যের দিকে। বিভীষিকাময় প্রহেলিকার দিকে। টানটান চিত্রনাট্য কোনো যেন আমাকে গিলে খাবে। আটকে যাই মায়ার মতো। কলম না গিরগিটি বুঝতে পারি না।

রঙের সাথে গুলে যেতে থাকি। সর্বস্ব রঙ যেন মরীচিকা। শেষে আমি নিরুদ্দেশ হয়ে যাই। কোথায় শুরু কোথায় শেষ।খেই হারিয়ে কোথায় গদ্যে কোথায় আর এই হাঁটা !

From here  you never know ,What will be happening at the end...


Friday, November 20, 2020

        " চা-ফুল এবং ভাতের মিছিল "

           - ধীরাজ কুমার রায় |

                 কালো কম সাদা বেশি , এমন দাড়ির ঝোপে হারিয়ে গেছে চোপসানো গাল | উপর-নীচ দুই সারিতে মেরে-কেটে ছয়-সাতটি দাঁত কোনো রকমে বজায় রেখেছে নিজের অস্তিত্ব | ঠোঁট দু'টো আপ্রাণ চেষ্টা করছে - একটুকরো নির্ভেজাল হাসি উপহার দিতে , পারছে না | কাঁঠাল পাতার ভেঁপুর মতো - বেজে ওঠার আগে কেঁপে যাচ্ছে বারংবার | উঠছে নামছে , দ্রুতলয়ে | স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছি তার দিকে | বুঝতে পেরে এগিয়ে এলো | জিজ্ঞেস করলুম , " কি ব্যাপার মোহরাদা তুমি ঠিক আছো তো ? তোমার শরীর কাঁপছে কেনো ? সকাল - সকাল ছাইপাশ গিলেছো ! " একসঙ্গে এতো প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলো না বোধহয় | অপ্রস্তুত হয়ে - একটা পুরোনো প্লাস্টিকের কেরিব্যাগ এগিয়ে দিলো আমার দিকে | " কি আছে ওতে ? "
....." চা ফুল, আপনার জন্য | বেশি না কুড়িটা টাকা দিলেই হবে !"......এবার অসময়ে মেঘ জমলো - আমার চোখে | মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম , বৃষ্টি অনিবার্য | ছাতা বা বর্ষাতি ছাড়াই পথে নেমে - অকাল বৃষ্টিতে আমি দিশেহারা | আকাশ মুখ ভার করে থাকলো, একটা নিশ্চিত আড়াল চাইছি এবার ! বড্ড অপ্রস্তুত আমি, দ্রুত এগিয়ে গেলাম অফিস ঘরের দিকে | অনেক সময় সমস্যা হাতে রেখে সমাধান খুঁজতে হয় , অবশিষ্ট হাতে রাখা বিয়োগের মতো | অফিসের জানালার দিকে তাকালাম , বাইরে বিস্তৃত সবুজ বুক নিয়ে চিৎহয়ে শুয়ে আছে খেলার মাঠ | একটা বক একপায়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ,মাঠের পাশে উঁচু নদী-বাঁধের উপর | গতবছর করম পুজোর আগের দিনই অনেক গল্প করেছিলাম আমরা | সুযোগ পেলেই অদ্ভুদ সাইকেল যাত্রার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা শুনতাম তার কাছে | সর্বশিক্ষা মিশনের বিজ্ঞাপনের খুঁটিতে আজও তার আশ্চর্য সাইকেলটা রাখা | কেরিয়ারে হ্যান্ড-পাম্প , হ্যান্ডেলে ঝোলানো ব্যাগে সারাইয়ের যন্ত্রপাতি | বছর পাঁচেক আগেও খড়িবাড়ি, মেটেলি, কেরন , বান্দাপানি , অবাধ বিচরণ এই দু'চাকার যানবাহনেই | পথে কোনো সহযাত্রীর সাইকেল বা বাইকের পাঙচার সারিয়ে একবেলা খাওয়ার সংস্থান হয়ে যেত অনায়াসে | বাইরে এলাম | দেখি , তীর্থের কাকের মতো এখনো দাঁড়িয়ে | একের পরে এক সিঁড়ি ভেঙে নামছি আর ভাবছি - ঋষি অগস্ত্য ফেরেনি, আমি ফিরেছি ! ফিরেছি আবার পাহাড়টার মুখোমুখি | বিধ্বস্ত |
              মোহরা রাজগোর | তার সঠিক বয়স উদ্ধার করতে পারিনি গত সতেরো বছর ! সরুগাওঁ চাবাগানের আদিবাসী সমাজের মানুষ | লকডাউন  বিপন্ন করেছে জীবন | ছানিপড়া একজোড়া চোখ - আমাকে বিদ্ধ করতে থাকলো করুণ দৃষ্টিতে | আহত হলাম | অপরাধ বোধ নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলো | সত্যি তো, দীর্ঘ লকডাউনে কিকরে বেমালুম ভুলেগেছি অসহায় বৃদ্ধের কথা ? মানবিকতার বাটখারায় একপ্রান্তে রাখলাম নিজেকে, অন্যপ্রান্তে অস্তাচলে যাওয়া সূর্যের মতো মানুষটাকে | ক্রমশঃ হাল্কা হয়ে উপরে উঠে যাচ্ছি আমি এবং আমার বাটখারা ! আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি নিজেকে ভারী প্রমান করে নীচে নামানোর | ব্যর্থ হতে থাকলো আমার মিথ্যে প্রয়াস ! মনে হলো আরও গভীরে নেমে যাচ্ছে মোহরাদা | হাত বাড়িয়ে যত সহজে আকাশ ছুঁতে পারবো - তার অনেক নীচে নেমে গেছে ওর বাটখারা ! চারপাশে ছড়ানো শিশির ভেঁজা অজস্র চা-ফুল আর এক খানি শূন্য অ্যালুমিনিয়ামের থালা | হঠাৎ তীব্র বেগে ছুটতে শুরু করলো থালাখানিও | আমার বিরুদ্ধে জমে থাকা সমস্ত অভিযোগ সম্মিলিত ভাবে চিৎকার করে উঠলো একসময় | স্পষ্ট দেখছি , পাড়ার মোড়ে - বিক্ষুব্ধ গরম ভাতেরাও মিছিলে স্লোগান তুলছে , " ধিক ধিক ধিক্কার !"....
    ........ " মাস্টার বাবু , ফুলগুলো নেবেন না ? "..... এবার সত্যি চমকে উঠলাম | কতটা সময় ধরে ভাবছিলাম আমি ! হাত বাড়ালাম প্যাকেটটার দিকে | আশ্বিনের হাল্কা শিশির তখনো লেপ্টে আছে - ফুলগুলোর শরীর আঁকড়ে | বুঝলাম, ভোরবেলা ঘর ছেড়েছে ফুলগুলো | 

আমার দূর্গা

দেবপ্রিয়া পন্ডিত

"আমরা নারী,আমরা পারি"। সত্যি আমার মা সেটা করে দেখিয়েছেন। বড় অভাগী আমার মা। ভাগ্যদোষে অজান্তে বরমাল্য পড়িয়েছিল এক পাগলকে।২ বছর সংসার করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আদর্শ স্ত্রীর মতো ডাক্তার বৈদ্যর কাছে দৌড়েছে স্বামীর আরোগ্যের জন্য। কিন্তু বর্বর স্বামী গভীর নেশায় আসক্ত তাই স্ত্রীর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এর‌ই মাঝে আমি পৃথিবীতে আসতে চলেছি, তখন মার অবস্থা মরোমরো। হাসপাতালেই কাটিয়েছেন বেশিরভাগ সময়।

অবশেষে আমি আসি পৃথিবীতে। জানিনা আমি আসায় আমার বাবার মনে কতটুকু খুশির ঝলক এসেছিলো। হয়তো আসেনি, তাই জন্মলগ্নে বাবা ছিলোনা আমার পাশে, আজ‌ও নেই। কোনোদিনই থাকার চেষ্টাও করেনি। আমার মা'র শ্বশুরালয়ে থাকার দুই বছর অনিদ্রা, প্রচন্ড মারধর, অশান্তিতে কেটেছে। এমনকি বৌভাতের দিন‌ই বেল্টের  আঘাতে কালশিটে পরেছিল পিঠে। যেদিন বাবা ছোট্ট আমিকে বিছানা থেকে ফেলে দিয়ে মাকে আবার মারধর শুরু করেছে, সেদিনই মা নিজেকে আর আমাকে বাঁচাতে সব কিছু ছেড়ে চলে এলো বাপের বাড়ি। শুরু হয় সংগ্রাম। সেই ছোট্ট আমিকে দিদার কাছে রেখে সকাল, বিকাল ও সন্ধ্যায় টিউশনি পড়াত। আস্তে আস্তে আমি বড়ো হচ্ছি, অন্যদিকে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে ভীষণ ক্লান্ত আমার দুর্গা। মা দুর্গার মতো দশ হাত না থাকলেও, মনোবল ভীষণ শক্ত। দাদুর জমি সহ ছোট্ট বাড়িটাকে ধীরে ধীরে সামান্য নিজের হাতে সাজিয়ে চলছে এখনও। এখন মা খুউব ছোট্ট একটা মুদির দোকানের মালিক। আমি বড়ো হচ্ছি, মা করছে অক্লান্ত পরিশ্রম। লক্ষ্য একটাই আমাকে মানুষের মতো মানুষ করা। বাবার স্নেহ ‌‌ও ভালোবাসা আমার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে মায়ের পবিত্র পরিশ্রমে।

দিদা ও দাদুর দেখাশোনার পাট চুকিয়ে গেছে। এখন শুধু আমাকে নিয়েই তাঁর জগৎ ও তাঁর কর্ম। পিশাচরূপী মানুষের কটূ মন্তব্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে চলেছে একাগ্রতার সাথে। সংগ্রাম‌ই হয়তো মায়ের ভবিতব্য। জানিনা মায়ের হাতের এই বৈঠা ধরে মাকে কতটুকু সুখের ছোঁয়া দিতে পারব। আমার মা 'আমার দুর্গা'। তাঁর দৃঢ় মনোবলকে অনুসরণ করে এগোতেই হবে আমায়...

আমার দুর্গা চিন্ময়ী

চুমকি বিশ্বাস

সংসার ধর্ম পালন করা মূল কর্ম তাঁর। লেখাপড়াও জানেনা সে, অতি সাধারণ জীবন যাপন করে। গোয়াল ভর্তি গরু বাছুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব। শাখা, পলা, সিঁথি ভর্তি সিঁদুর দিয়ে অতি সাধারণ করুণাময়ী সাজ তার। দেখলে মনে হয় দেবী। শত্রুদের ডরায় না সে। বিপদের সময় সবার আগে এক পা এগিয়েই থাকে। নাম তার অন্নদা। সেবায় সে দেবী অন্নপূর্ণা। বিড়ি বেঁধে সংসারের ভান্ডার পূর্ণ করার চেষ্টা করে। হাতের কাজের গুণ আছে। তিন ছেলে-মেয়ে মানুষ করেছে পেটে গামছা বেধে। এক বিঘে মাটি রেখেছে সাত দিন গমের ছাতু খেয়ে। মহাদেবের মতো পতি তার সমাজসেবায় ব‍্যস্ত। হতে পারে গ্রাম্য নারী, তবে সমাজে সহজে পরাস্ত হতে নারাজ। জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পেয়েছি শুধু তাকেই দেখে। সে আর কেউ নয় আমার দশভূজা আমার দিদা আমার দুর্গা।

প্যাঁচ গোজ বোঝেনা সে সহজ সরল মন। খালি পায়েও চলতে পারে বিলক্ষণ। জুতো পরলে মাথা গরম হয়ে যায়। কখনো বা দুরকম জুতো পরে বিশ্ব পরিক্রম করে আসে। মন ভোলা দুর্গা আমার। এই নিয়ে মহাদেবের খুনশুটি চলে অনর্গল। এমনিতে মনটা ভালো। কারো কথাতে বিরক্তি বোধ করেন না মোটেও। দেশ-বিদেশে থাকে ছেলে মেয়েরা, অথচ দূর থেকেই বুঝতে পারে তারা অসুস্থ কি না। সে যেন আমার চিন্ময়ীরূপে আমাদের দুর্গা মা।

পল্লীর দুর্গা

পাঞ্চালি দেবনাথ

আমার দুর্গা থাকে গ্রাম্য পল্লীতে। সে হাজার ব্যস্ততাতেও নিজের ভালো মন্দ নিয়ে না ভেবে তার রত্নের কথা না ভেবে থাকেনা। আমার দুর্গা বড়ো দুঃখী। অভাবের সংসারে আমার দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। অনেক কষ্টে তিনি তার রত্নকে শিক্ষিত করে তুলেছেন। সে স্বামীর  অনুগত। তার চোখের তলায়  অযাচিত  কালী মুখে সৌখিন বলিরেখা। কাঁচাপাকা চুল আর ঘামে ভেজা মুখটা তাঁরই।

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংসার সামলে আঁচলে মুখ মোছে। ক্লান্তিতে  দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। ঘুমন্ত মুখটা দেখে বড্ডো মায়া হয়। খাবার সময়টুকুও পায়না। মুখে খাবার তুলে দিয়ে তৃপ্তি পাই আমি। সে বড়ো ক্লান্ত, বড়ো অভাগী।

কখনো বলা হয়নি মা তোমাকে যে বড্ডো ভালোবাসি মা। সে শত শত আঘাত বুকে নিয়েও মুখ বুজে থাকতে পারে। প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে উঠতে পারে।  শত দুঃখেও তাঁর মুখে হাসি। চোখের জলে মুক্তো খুঁজি। সেই জলও বড্ডো দামী। দশ হাত না থাকলেও আমার দুর্গা দশ দিকের ঝঞ্ঝা দুহাতে সামলাতে পটু। সে আমার আমার মিত্র, সখি। দুঃসময়ে সাহস যোগান তিনি। আমি নিশ্চিন্তে তাঁর কোলে মাথা রেখে পরম তৃপ্তি পাই। কালো আকাশ মাথায় নিয়ে ছাতা হয়ে দাঁড়ায় আমার দুর্গা। কখনোবা প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। সমস্ত প্রতিকূলতা, সবকিছুকে পেছনে ফেলে দুর্গা চলে সামনের দিকে এগিয়ে। তাঁর কোনো তুলনা নেই। তার জুড়ি মেলা ভার। আমার দুর্গা আমার কাছে সেরা... সমাজ তাকে ঘরের বৌ বললেও সে আমার কাছে দুর্গতিনাশিনী দুর্গাই। আমার মাই আমরা দুর্গা।

সাধারণ নারী

অমৃতা মন্ডল

সেই দুর্গা, সেই কালী। সেই অন্নপূর্ণা দেবী। যে রূপ তাঁর প্রয়োজন সেই রূপ ধারণ করেন। এ হচ্ছে ঘরের গৃহিনী। কারোও মা, কারোও জীবনসঙ্গিনী, কারোবা দিদি। লক্ষী হয়ে ঘর আলো করে। অন্নপূর্ণা হয়ে সকলের মুখে খাবার তুলে ধরে। সরস্বতী হয়ে বিদ্যাবুদ্ধিতে মন জয় করে। সতী হয়ে মহাদেবের পাশে থাকে। পার্বতী হয়ে সন্তানের খেয়াল রাখে। কালী হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওযাজ তোলে। দশভূজা হয়ে সকলের সেবা করে। প্রয়োজনে অসুরের বিনাশ করে। সে আমাদের মা হয়ে ঘরে থাকে। প্রয়োজনে দুর্গারূপী চিন্ময়ী মা হয়ে ওঠে।

"নারীর সম্মান, অবহেলা করে যে নারীরে তাহারেই করো পূজা। সম্মান যদি করেই থাকো, দিও তাঁরে নির্দিষ্ট জায়গা। লান্ছিত করো, অবহেলা করো, করো তার সম্মানহানী। শ্রদ্ধা যদি করে থাকো, ঘর বন্দী কেন সে নারী?"

ঘরের লক্ষী। সেও এক নারী, করো তারে অত্যাচার? সে যদি রূপ নেয় মা কালীর রক্ষে পাবেনা আর। লজ্জা, সম্মান, দয়া, মায়া নারীর প্রকৃত পরিচয়। অত্যাচারের ফলে তার সহ্যের বাঁধ যদি ভাঙো চোখের জলে চন্ডীর অবতার নিতে দেরি হবেনা আর। যে রূপেই থাকুক সে সম্মান  করো তাঁকে। আর করো যদি অবহেলা রাবণরূপী হও় যদি সমাজে তুমি বার বার, পাবেনা নিস্তার। দুর্গা রূপে এক সাধারণ নারীর হাতে নিশ্চিত তোমার বিনাশ।

Monday, October 26, 2020

 যাকে পাবি তাকে খা 

 সোমনাথ বেনিয়া



কালো বিড়াল! হাঁচি! শরীরে আঘাত! অত‌এব দাঁড়িয়ে যাও। এই যে দাঁড়ালে তা কিন্তু পারতপক্ষে পেটের জন‍্য। পেটের ভিতরে দৌড়। পেটের বাইরে দৌড়। রান অ্যান্ড রান অ্যান্ড "ক‍্যাচ মি ইফ ইউ ক‍্যান!" কোথাও মস্তিষ্ক, কোথাও-বা গতর। মস্তিষ্কের কোষে-কোষে শ্রম আর গতরের চামড়ার ভাঁজে ঘর্মাক্ত পরিশ্রম। দু-ক্ষেত্রেই "ওয়ান পাইস ফাদার মাদার!" মাথা ঝিমিয়ে যায় আর ক্লান্তির অকৃত্রিম আক্রমণে শরীর নেতিয়ে পড়ে। অ্যাট দ‍্য এন্ড অব দ‍্য ডে দু-জনার প্রয়োজন বিছানা। এখন তুলতুলে নাকি শুধু তক্তা, তা বিবেচনা করতে গিয়ে পূর্ণিমার সাথে পেঁচার গোপন বৈঠক হয়। পূর্ণিমার আলো নরম, কোমল, স্বপ্নালু, অন‍্যদিকে পেঁচার ঠোঁট কঠিন, কঠোর, বাস্তবিক। তবু স্বপ্ন একটা থাকে যে আসে রক্তকণিকার সমস্ত বাধা পেরিয়ে। স্বপ্নের রঙ বদলে গেলে হৃৎপিণ্ডের ওঠা-নামা হাঁসের ঠোঁটের পর্যায়ক্রম হয়ে ওঠে। যেন একথালা ভুসি মেশানো পানতা ভাতের মধ‍্যে ঠোঁট দুটির কতকত শব্দে অবিরত নড়ে চলা। কী দেখবে? খিদের রাজ‍্যে শিল্পী সত্তার গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো হয়। প্রতি মুহূর্তে চরাচর ডুবে থাকতে চায় ভোগবাদীর চূড়ান্ত অসুখে। সেই অসুখপ্রিয়তা প্রাত‍্যহিকীর আনাচকানাচ থেকে তুলে আনা কদম চালে চলা সারিবদ্ধ মুখের কষ্টকল্পিত নিশ্বাস।
     খিদের জ্বালায় এখানে সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। জটিল রসায়ন ফ্লয়েডিয় তত্ত্বের ঘাড়ে বসে থাকে। সম্পর্কের সরু তারে অভিধানের বাছা-বাছা শব্দগুলো ব্রাউনিয়ান মোশানে দৌড়ায়। এই আপেক্ষিক জীবনে কার ভালো, কার মন্দ কিংবা এর উলটো ঘটনা‌ও দোলাচলে থেকে মাঝেমধ‍্যে "জরুরী অবস্থা" জারি করে। ঠোঁটের সাথে ফুঁয়ের মিলবন্ধন ঘটলে মাউথ অর্গান বিপ্লবী হয়ে ওঠে। আশেপাশের যত ছড়ানো-ছিটানো মন আছে, তাদের সবার মধ‍্যে যেন তাদের নিজস্ব প্রিয়সুর অ্যাকসেস খুঁজে পায়। তখন সবাই সবার আইডল। প্রত‍্যেকে প্রত‍্যেকের রূপকথার নায়ক হয়ে যায়। আলোকবর্ষ দূর থেকে ছিটকে আসা কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর অভিকর্ষের টানে গ্রন্থিত হয়ে ছুটে আসে। ফিল্‌মের দৃশ‍্য। নায়িকা ছুটে যাচ্ছে নায়কের কাছে। তারপর একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ। জেগে ওঠে আদিম খিদে। নলেনগুড়ের মতো চুয়ে পড়ে শরীরী উপাদান। ঘোষণা হয়ে যায় "কোহি মিল গ‍্যায়া!" আনন্দ তখন শব্দের খেলাঘর। প্রেমের শব্দছক। শুধু ঘরের পর ঘর মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। থমকে দাঁড়ালে মনে হয় "অ্যায় মসোম বড়া বেইমান হ‍্যায় বড়া, বেইমান হ‍্যায় অ্যায় মসোম!"

Saturday, July 25, 2020


মুক্তগদ্য :
           "  রাস্তা থেকে লিখছি তোমাকে "   
                     - ধীরাজ কুমার রায় 

                                     ( ১)
অনন্যা, 
            ঠিক এই মুহূর্তে তোমরা কেমন আছো - জানিনা | বাড়ি আসছি | আর সামান্য পথ বাকি | টিপলুর জন্য একটা নতুন জামা কিনেছি | ওর খুব পছন্দ হবে ! তবুও লিখছি তোমাকে | লিখছি এই ভেবে যে - শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবো তো !
         বান্টিও তো আমিনার কাছে ফিরতে চেয়েছিলো ! ছোট্ট রিয়াজ ওর পথ চেয়ে দিন গুনছে | শরীরটা একটু খারাপ ছিলো বলে - বাকিরা ওকে জোর করে ট্রাক থেকে নামিয়ে দিলো | আমিও নামলাম | আমার কাঁধে ভর করে বেশ কিছুটা পথ এসেছেও ! তার পরে বসবে বলে - মাটিতে শুয়ে পড়লো  | জল চাইলো আমার কাছে | বোতলটা খুলে মুখের কাছে ধরলাম | চোখ বন্ধ দেখে ডাকলাম - " বান্টি , এই বান্টি ! " সাড়া নেই | সজোরে ডাকলাম - "বান্টি...... "
         কোনো সাড়া পেলাম না ! সামনের শূন্য রাস্তাটা আমার গলা নকল করে জোরে ভেংচি কাটলো | বুঝিয়ে দিলো - বান্টি কোনো দিনই আর আমিনা ও রিয়াজের গল্প বলবে না ! 
       বান্টি এখন পরিযায়ী মৃতদেহ | ভিন রাজ্যের পুলিশ এসেছে | একটু আগে এলেও তো রিয়াজ নতুন জামাটা পরে বলতে পারতো - " আব্বু , খুব পছন্দ হয়েছে জামাটা ! "
               ওরা (পুলিশ ) কেউ কাছে আসছে না কিন্তু ! অথচ হাজারো প্রশ্নে বিরক্ত করছে আমাকে আর মৃত পরিযায়ী বান্টিকে !  "কোথায় ছিলাম, বাড়ি কোথায় ? হেঁটে ফিরছি কেন ? ওর করোনার লক্ষ্মণ ছিলো কিনা ! " ইত্যাদি -ইত্যাদি | 
                কিকরে বোঝাবো ওদের যে - বান্টির করোনা ছিলনা ! ছিলো শুধুই রিয়াজ - আমিনা আর অপরাধী তিনটে পেট ! 
                                     ( ২)     
অনন্যা, 
আমি এখনো অবশিষ্ট এক - তৃতীয়াংশ রাস্তা থেকে লিখছি তোমাকে | আমার কোলে এখনো নিশ্চিন্তে - অনন্ত ঘুমে বান্টি | সামনে ঈদ | রিয়াজের জন্য কেনা নতুন জামাটা আমার হাতে | ভাবছি - জামাটা পৌঁছাতে পারবো তো ? বান্টি বলেছিলো, - রিয়াজকে খুব মানাবে ! আমিনা আর রিয়াজ কেমন আছে অনন্যা ? 
পুলিশ এবার সাজ পোশাকে সদলবলে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে | বোধহয় বান্টিকে নিতে এসেছে ! ওরা এতো জোরে কেড়ে নিলো বান্টিকে !  আমি কিছুতেই ওকে আটকাতে পারলাম না ! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওরা ? আমাকে নিলোনা কেন ? 
        আমি বড্ড একা এখন ! পিঠে আমার আর বান্টির দুটো ব্যাগ | হাতে টিপলু সোনা আর রিয়াজের জন্য কেনা জামা দুটো | 
       অনেক্ষন পর দাঁড়ালাম | আমাকে বাড়ি যেতে হবে তো ! তুমি কি টিপলুকে কোলে - উঠোনে দাঁড়িয়ে আমার রাহা দেখছো ? আমিনা আর রিয়াজও কি একই ভাবে বান্টির অপেক্ষায় ? টিপলু এই এক বছরে অনেকটা বড়ো হয়েছে না ? রিয়াজও একই রকম হয়েছে বোধহয় ! ওরা তো সমবয়সী | মাঝে মাঝে আমিনাদের বাড়ি যেও | খোঁজ নিও - ওরা কেমন আছে !
                            ( ৩ )
অনন্যা , 
আমিও ঠিকমত হাঁটতে পারছিনা কেন - বলতে পারো ? পা দুটো কাঁপছে ! ভয় পেওনা ! হাঁটতে আমাকে হবেই ! মুম্বাই থেকে প্রায় এক তৃতীয়াংশ পথ তো চলে এসেছি ! আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি - তুমি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে | টিপলু চেঁচিয়ে ডাকছে - " বাবা "......
টিপলু ' অ - আ ' লিখতে পারে এখন ? ' বাবা ' বানানটা  প্রথমে শিখিও ! 
         মাথাটা ঝিম ঝিম করছে ! ও কিছু না , দুদিন ঠিকমতো খাওয়া হয়নি - সেজন্য বোধহয় ! আসলে বান্টি এতো বেশি রিয়াজ আর আমিনার কথা বলছিলো যে খাওয়ায় মন দিতে পারিনি ! তোমরা ঠিকমতো খেও কিন্তু !
       টিপলুকে ঠিক সময় খাইয়ে ঘুম পাড়িও ! ও কি খুব দুস্টুমি করে আজকাল ? এখনো বিরক্ত করে কি - বাবা কখন আসবে ? 
    তুমি কি কোনো শব্দ পেলে ? আরে না না ব্যাগের শব্দ  | আমিই রাখলাম মনেহয় ! আজ তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বেলেছো ? পারলে একটু বেশিই তেল দিও আজ ! হাওয়ায় নিভতে দিও না ! অন্তত আজ রাতটুকুর জন্য |
          চোখ টানছে | আমি ঘুমিয়ে গেলে - তুমিও টিপলুর পাশে একটু ঘুমিয়ে নাও ! আর কতক্ষন জাগবে তুমি ? ঘুম থেকে উঠে  দেখো - আমি হয়তো পৌঁছে গেছি |