Showing posts with label একাধিক কবিতা. Show all posts
Showing posts with label একাধিক কবিতা. Show all posts

Saturday, February 24, 2024

মৃত্যুর পর

 

সমর দেব

 

একান্ন বছর পাঁচ মাস তিনদিনের শেষে

এক আবছায়া বিকেলে আমি মারা গেলাম

মৃত্যুর ঠিক আগে আমার কিচ্ছু মনে আসেনি

শুধু মনে পড়েছিল জন্মের আদি মুহূর্তটি

সেটা ছিল অঘ্রাণের মৃদু শীতের এক শেষরাত

আকাশে ব্যস্ততা ছিল তারাদের অনেকেই ততক্ষণে

ডুবে গেছে হিরণ্ময় আলোর গর্ভে

তার অনেক আগে চলে গেছে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ

প্রসূতিকক্ষে বিজলি আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল

সমস্ত দৃশ্য কথা বলছিল ডাক্তার নার্সেরা, তাদের

কণ্ঠের আওয়াজ আমার কানে বাজছিল

সুরেলা সংগীতের মতো তাতে আবাহন ছিল

এটুকুই জন্মমুহূর্তের স্মৃতি ভেসে উঠেছিল

শেষের বেলায়। আশ্চর্য, আমার ক্ষুধা ছিল না!

Wednesday, August 4, 2021

 জীবন যেমন দেখি


সজলরঞ্জন হালদার




১) 


লাল পিঁপড়েরা ক্রমে কালো পিঁপড়ে হয়ে গেলো : এখন আর অন্ধকারে আলাদা করা যায় না ; মিছিলে হাঁটা ভাঙচুর মুখ, হামাগুড়ি কাটে পথশ্রান্ত দীর্ঘশ্বাসের মতন !


২)


ওদিকে সারাদিন অরণ‍্য ঘেঁটেঘুটে কালকেতু একটা গোসাপ কাঁধে ঘরের পথে হেঁটে যায়; কালো শরীর ঘিরে ব‍্যক্তিগত শিকারহীন আক্রোশ ।


৩)


দলিত-আদিবাসী মানুষের অধিকারের স্বার্থে জেলের অন্তরালে নিঃসঙ্গ একা একা শহিদ হলেন... ৮৪ বছর বয়সি  স্ট‍্যান স্বামী !রাষ্ট্র এখানে নিঝুম রাতের মতো মূক ।স্বপ্ন দেখা গুটিকয়েক মানুষ শহিদের শব কাঁধে হেঁটে চলে অনন্ত মহাশ্মশানের পথে...


৪)


মাছরাঙার ঠোঁটে আঁশটে মাছের গন্ধ ।কাকের ঠোঁটে কবেকার শুকনো রক্তের দাগ ।কাঠঠোকরা ঠুকরে চলেছে প্রবীণ বৃদ্ধ শরীর । শালিকের বাচ্চা মুখে নেমে আসে প্রকাণ্ড  হলদেটে দাঁড়াশ ।


৫)


বাস্তুতন্ত্রের কথা ভেবে পৃথিবীর শরীর জুড়ে হিজিবিজি দৌড়াদৌড়ি করে পিঁপড়ের সারি ! সুখী মানুষ চিরকাল পালকের নীচে নরম মাংসের ওম খোঁজে ; নাটকের মতো বদলে যায় চরিত্র ।

Tuesday, August 3, 2021

বাস্তুতন্ত্র ও অন্যান্য 

নীলাদ্রি দেব 



এক. 

দুপুর ভর্তি কমলা বাগান 

চায়ের সরঞ্জামের পাশে স্থির উত্তাপ 

নেশামুক্তিকেন্দ্রের বিজ্ঞাপনের বিপরীতে

                               চামড়াহীন সাপলুডু

নির্দিষ্ট আয়তন ঘেমে জল গড়িয়ে যায় 

কেবল কমলা বাগান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে

                                                          কাঠবেড়ালি


দুই.

একটা ছোট খাট আছে. নিচু. পাশে ওপর-নিচ লম্বাটে জানালা. ঘরে শুয়েই অনেকটা আকাশ দেখা যায়. বর্ষা ভাইরাস ইত্যাদি কারণে সব জানালাই বন্ধ রাখতাম. চোখে অন্ধকার সয়ে গেছে. আজকাল নরম ভেজা আলো দেখতে খুব লোভ হয়. আবার গরম বাড়ছে. জানালা খুলে দিয়েছি. গাছের পাতা নড়ছে না. অদ্ভূত কোণ থেকে খানিকটা দূরের কোনো অ্যান্টেনা দেখি. তীব্র একা. অথচ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় না. কয়েক জোড়া চড়ুই দেখেছি. অনেক দিন পর খুব স্পষ্ট শুনেছি ওদের ডাক. মাকে বললাম ছাদে কিছু দানাপানি রেখে আসতে. এরই মধ্যে ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে থুনবার্গের কথা শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল, আমরা বারবার অন্ধকারেই আলকাতরা ছুঁড়ে দিই. দুপুরে চোখ লেগে এল. দেখলাম, একটা আলবিনো শিঙি রঙ হারিয়ে ফেলছে. ক্রমে কালচে হয়ে এল. একে আমরা স্বাভাবিক ভাবছি. কিন্তু... হঠাৎ আঁতকে উঠলাম. এতক্ষণ চারটে তারের মাঝে সুর খেলছিল. যেন বৃষ্টির প্রার্থনা. ক্যাসেট জড়িয়ে গেছে. ঘামছি. পাখা ঘুরছে, তবু.


তিন.

বৃত্ত এঁকেছি. কেন্দ্র বলতে একটা বিন্দু. কখনও বিন্দুর থেকে নিজেকে ছোট করে নিই, বৃত্ত মনে হয়. কখনও বৃত্তকেই কেন্দ্র ভাবতে ইচ্ছে করে, মূলত ভূমিকম্পপ্রবণ শহরের গল্প বলতে সবচে উঁচু কোনো ছাদে উঠে এলে. আকার, দূরত্ব... এসবের ওপর কর্পূর ছিটিয়ে দিত মা. শুনেছি এতে নিজস্ব অধঃক্ষেপ বেড়ে যায়. কিন্তু এতো দ্রুত উবে যায় সব, বিকেল ও সন্ধের সীমান্তে আমার শ্বাসকষ্ট হয়. যদিও গাছের কাছে গাছ দাঁড়াতে পারে না, বিল্ডিং দাঁড়িয়ে যায়. যে/ যা যত দ্রুত দাঁড়ায়, শুয়ে যায় কি? এসবের কোনো সমীকরণ নেই. তাই হয়তো এক্স ধরে নিই. সীমানা প্রাচীরে যৌথ 'হ্যাঁ' লেগে আছে. দীপাবলীতে তেল চুঁইয়ে যাওয়া প্রদীপ. অতএব অঙ্কতে টেনশন ক্রিয়েট হল. সব সমস্যায় সমাধান থাকতে নেই. কিংবা থাকতে আছে. মনোক্রোম দৃশ্যের শেষে মোড়লের হুঁকো থেকে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়ার মতো স্থির কিছু.

এসব আজগুবি আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না. 

অথচ কিছুতেই পাণ্ডুলিপি বদলাতে পারছি না.

 কাটোয়া লোকাল

---------------সঞ্জয় সাহা


(৮)
অশান্তি হলে আমাকে ডেকো
আমিও অশান্তি হলে তোমাকে ডাকবো

দুজনেই দুজনের শুশ্রূষা।
কলোনির 'অন্নপূর্ণা হোমিও হল'

(৯)
খনি থেকে কালো বাতাস আসছে
প্লাস্টিকদূষণ চারদিকে
অঙ্কুরোদগম
আশাবরী রাগ
খাবার পরে দুটুকরো আমলকী

এইসব অভ্যস্ত মৌনতার ভেতরে
একটা বেড়াল মুখ তুলতে থাকে।

(১৭)
তোমাকে সূর্যনন্দিনী বলে ডাকবো
এরকম ভেবেছি মনে মনে

ব্ল্যাকহোল ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে
আমরা কী দেখেও দেখবো না সেসব!

প্লেজারিজমের অভিযোগ তুলবেন স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র

(২২)
গুছিয়ে নিচ্ছি ভয়,গুছিয়ে নিচ্ছি আন্তরিকতা
নদীর দুপার জুড়ে তীব্র হালুম গন্ধ

অভিমান জমে জমে সঞ্চয়জাত পর্বত
তবু দেখ মুক্তলিপি রোদ নামছে

আর থালা জুড়ে পেলিকান ক্রসিং

(২৭)
ফেলে যাচ্ছি অভিমানগুচ্ছ
রাগ ক্রোধ অথবা যা আরও ব্যক্তিগত

পাতা ও ধুলোর ভিতর
আড্ডা ও কবিতার ভিতর
এক নিরামিষ প্লেটোনিক স্বাদ

তবু তুমি কাটোয়া লোকাল
এক অনন্তবিষাদ।




 

 নদীমূর্তি 

শিবু মণ্ডল 



১। 

ভাঙল!

দেখো এই দূর তল্লাটে এসে আমাদের অভিমান ভাঙল

দেখাগুলো কেমন বদলে গেল নদী ও বনের খামখেয়ালিতে 


বয়সের আগামাথা নেই এমন একটি শাল গাছে

ফুটে আছে লাল ছড়ার মতো অর্কিড


এরপর যাবতীয় সতৃষ্ণ বোঝাপড়া 

নদীমূর্তির পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে 

শেষে কাঙ্ক্ষিত স্রোত হয়ে বয়ে যায়


২। 


যা কিছু বলার ছিলো 

সম্ভাব্য আলাপের পরও বলা হল না

গহীন অরণ্য এসে ঘিরে রাখে কথা

সালোকসংশ্লেষের অনিবার্যতা শেষে 

চোরাবালিতে তলিয়ে গেল ফুল ও ফলের পতনশব্দ 


৩।  


মাঝখানে নদী এঁকে দিলে 

বনেও বিরহ রং সাজে  

কুড়ুলের ঘা’য়ে কিছু গাছ শুধু 

কাঠ হয়ে যায় সেতু হবে বলে 


তারপরেই শুরু হয় এক অন্য ভ্রমণকথা... 


৪। 


একই শরীরে অর্কিড ও ফার্ন নিয়ে 

দাঁড়িয়ে আছো বিপন্ন শোকে

জলের তলে লুকিয়েছে রোদ  

অহরহ উঁকি দেয় মরণ পাড়ের ফাটল থেকে  

টুপটাপ ঝরে পড়ে মেঘ

একই সাথে গলা জড়াজড়ি করে

হেঁটে যায় বাঁধের উপর ভাঙনের উত্তরসূরি 


তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছ 

শরীরে অর্কিড ও ফার্ন নিয়ে 


৫।


বনানীর পথপাশে বসে থাকা

এক বিরল পাখি শিস্‌ দিতে ভুলে গেছে

এত নীরবতা!

এত নির্জন!

শূন্য রিসর্ট থেকে ভেসে আসে

কেয়ারটেকারের সাবধানবাণী

ঘরে ফিরে যাও ঘরে ফিরে যাও

এই নীরবতা ক্ষণিকের ভ্রম!

এই নির্জনতা ক্ষণিকের ভ্রম! 


পাখিটি জানে  কেয়ারটেকার জানেনা 

বিরহ জন্মের পর আর ঘরে ফেরা যায়না...   


৬। 


যেতে চাইলে চলে যাও

হেঁটে চলে যাও নদীটির দিকে 

বিজন সেতু ডাকবে না তোমাকে

চিতার পোড়া কাঠ, মৃতের ফেলে যাওয়া বিছানা

পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাও ভেসে থাকা নৌকার দিকে

নৌকার এই প্রগল্‌ভতাকে পুঁতে দাও জলের নিচে

নিষিদ্ধ চাঁদের রাতে তার এই নড়াচড়া মোটেই আইনসঙ্গত নয়


Monday, August 2, 2021

 

বিবেক রায়ের  কবিতা



 

রায়ডাক


হেঁটে যাওয়ার সময়
ছায়াও আমার সাথে হাঁটে
মৃত্যু অবধি কি এভাবেই হাঁটবে --
এ পথ যে অনেক দূরে নয়
বিপদের আশঙ্কা পেয়ে যে কবেই
প্রেমিকাও আঙ্গুল ছেড়েছে
সত্যি শরীরের ছায়া কি মৃত্যু অবধি যাবে
ভয় পাবে না. . .
কবরের জন্য যে জায়গা দেখা হয়ে গেছে ---- রায়ডাকের চড়ে


     কন্ঠ
-----
একা হয়ে যাচ্ছি , ভীষণ একা সময়ে সাথে সাথে
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সব ছেড়ে ফিরে যাই,
সারাজীবন নীরবতার পায়ে পড়ে থাকি
যেখানে আমি একা, কেউ কখনো বিরক্ত করবে না
আমি আমার মতো থাকতে পারবো
নির্জন জীবন -- যেখানে পাখিরা খোলা গলায় গাইতে পারে

আমি ভীষন সাধারণ মানুষ - আজীবন সাধারণ ভাবে থাকতে চাই
মাটির কাছাকাছি যেখানে শৈশব কালের কণ্ঠ লেপ্টে থাকে
পাগলের সাথে বন্ধুত্ব --- মন খুলে ওপার বাংলা কথা
যেখানে পাগলের মায়ের কবর রয়েছে
ভাঙা বাড়ির পাগলটি আমার জন্য লজেন আনত
আমি তাক খুব কাছ থেকে দেখেছি - ভুলেনি
এতো কষ্ট থাকার পরেও যার মনে ঈশ্বর ভক্তি ছিলো

লোকসঙ্গীত গাইতে পারি না, কিন্তু ভালোবাসি - আমি গান ভালোবাসি
তৃপ্তি পাই, মাটির গানেই বেশি
গ্রামের মানুষরা মুখোশ পড়তে পারে না  - অথচ তারাই বেশি ঠকে

টিকিট কেটে পরিচিত হইনি, বাবার টাকা ছিলো না - কলকাতার চিরীয়াখানার শুধু নাম শুনি
অথচ আমার অনেকের সাথেই বন্ধুত
গ্রামের পাশেই মাহুত হাতি ধরে আসতো কলো গাছ নিতে
দোলাতে শকুন - শৃঙ্খচিল - উড়ত আকাশ জুড়ে
ডুমুর গাছে কোকিল মধুর ডাকে বসন্তে ঘুম ভাঙ্গত
গাছে গাছে বাবুই - ঘুঘু - বাঁজ পাখি -
আরও কত পরিচিত পাখির দল ধান খেতে উড়ে যাচ্ছে
শৈশবে মানেই ফড়িঙ ধরা - বন্ধুদের সাথে আড্ডা
শিমুল ফুল - কদম ফুল নিয়ে থাকা
পুকুরে মাছ ধরা সংকোশ নদীতে স্নান - ডিগ বাজি
বিকেল বেলা গোল্লাছুট - কানা মাছি ভো ভো
কত কিছু হাতের নাগালে ছিলো -
যা এখনকার শৈশব ধারের কাছেও নেই,
এখন কার শৈশব মানেই - যান্ত্রিক - অন্ধকার জীবন সঙ্গী

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমি একা হয়ে গেছি
আমি আরও বেশি একা হতে চাই, এখন নির্জনে পছন্দ করি
আমি বাঁচতে চাই, সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে
আমার পূর্বপুরুষের সবুজের সাথে বন্ধুত্ব ছিলো



         পৃথিবী
----------------------
মনে হচ্ছে এক মাত্র মানুষ আমি
এ দূর দিনে শুধু অন্ন ধ্বংস করছি পৃথিবীতে 
একটা কৃষকে জানে -- একটা ধানের শিষের জন্য
কত কেজি রক্ত জলে করতে হয় ---
বারবার মনে হচ্ছে, এ পৃথিবী আমার জন্য নয়
আমি কোনো কাজের নই -- শেষ লোকটি আমি

আজকাল ---
দোতারার সংস্পর্শে আসতে ভয় লাগে
অথচ ঘুরে ফিরে স্মৃতি মাথা চারা দেয়
তোমাকে জেগে উঠতেই হবে -- শিশির বিন্দুতে

চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, কাঁদলে বুঝি
বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা মুছে যায়
কেঁদে কেঁদে শরীর ভেজে গেলেও আমার কষ্ট দূর হইনি --
যেমন শীতের দিনেও সংকোশে গভীর জল - স্রোত
আমিও কিন্তু একজন প্রেমিক হতে চেয়েছি আজীবন - পারেনি
আমি তো শৈশব থেকেই ফুল ভালোবাসি
বাতাসির মা জানে --- আমি কেমন মানুষ

কথায় থাকবো ---
মাথার উপর ছায়া দেওয়ার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো বৃক্ষ পাইনি ,
বেঁচে থাকতে --- ছায়া পেলে
হাসতে হাসতে আমিও মৃত্যু বরণ করতাম

আর তোমার কাছে সেটাই ম্যাজিক হয়ে যেত ----



    দূরত্ব
---------------
একটা মানুষ দরকার
যে আমার মৃত্যুর ঋণ শোধ করবে ---
আমি এখনে মৃত্যু লেখতে পারবো না,
আমার এখনো অনেক কাজ বাকি আছে যে . . .
জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে যতটা দূরত্ব শূন্যস্থান থাকে  . . .
আমি আরও কিছু দিন বাঁচাতে চাই --
হাতের ওপর হাত ঘুরিয়ে


 

অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা 



১

অতীতের মৃতেরা কি জানলো না
বর্তমানের মৃত্যুসমগ্র?
পেপারওয়েটের ভিতর
অসহায় বুদবুদ যেভাবে
একদশক পর হঠাৎ মিলিয়ে যায়।।

২

অবসাদের দুইটি প্রদীপ,
সমান্তরাল জ্বলে।।
মোমের গলন,
পদস্খলন,
একলা বয়ে চলে।।

৩

ছবিতে নয়, হাতের লেখায়,
স্বল্পভাষে মনে করি তোমায়!
পিছিয়ে পড়ে পিছন-সময় দেখা,
কলম ভাঙলে আঙুল জুড়ে তোমার
দুঃখকষ্ট যত্ন করে রাখা।।

৪

আতস কাঁচের আলো!
বন্ধুমুখের সুপ্রাচীন সে আলো!
বিকেল ভুলে অপার সন্ধ্যা নামলে,
বিস্মৃত শরাফতের সে আলো!
লাঙলসীমার আলো!
বিবেকবন্দী আলো!
বাতিঘরের পাহাড় থেকে,
গণকণ্ঠের হকিকত সে আলো!

৫

মালারমের লেখা পড়ে বুঝি
বইয়ের রহস্যবাস গভীরতায়
সরল জটিলায়িত হয় পাতার ভাঁজে
পাতা খুলে ধরলে প্রান্তবরাবর
ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে মালারমের গ্রন্থরূপ
শিলালিপির কথকতা হয়ে বাঁচে।।

 সমীরণ ঘোষের কবিতা



ঘুম


মেঝেতে দুধের শব্দ। লোহার অস্পষ্ট
খুনের অল্প হাতছবি
মেঝের কাগজে ডুবে জাহাজের ঘুম
চুড়ির সামান্য 
ছুরির ফলায় ছায়া। আঙুলের। কণ্ঠ অব্দি
ডাক আত্মহিম রঙের বেগুনি
নদীর আলতায় বুজে কাঠের সুদূর 



নিসর্গ 

আকাশ মাঞ্জা দিচ্ছে ঘুড়ির কয়েদ
নোয়ানো পাথরে জল। স্নানের চৌকো
বুদবুদে কাচের রাত। হাওয়া খেলনানগর
গুছিয়ে রাখার কোণে হাতবোমা। তখনও
ফুলছে

ঠোঁটের শবেও ভাঁজ। স্তন হাসির সুলুক 
নৌকো মাংসের ডাক। কুচোনো ঘুঙুর



মহরত

মেঘের খাঁচায় আজও বৃষ্টির ফুরোনো হাভেলি 
হাওয়ায় পিনেও গোঁজা আত্মহননের শিস
খেলনা পিস্তল থেকে ঘনঘন ছায়ার মহরত 
আত্মস্নায়বিক কোণে বজ্র জ্বলছে 

হত্যাপ্রবণ গ্রামোফোন
ঢেউ। আর খোপের নিখিল 


মুকুর

যেটুকু লাফাচ্ছে দিন ব্যাঙের মুকুর
ছড়ের লোহায় টানা আবহের দেশ
ফুলের শব্দে ঠাঠা মধু ফোটে 
তত তত শ্রুতির ভ্রমর
চোখের পাথরে এঁদো গলির ঘণ্টা 
পাখির কান্নার লাল। ঝামা ঝামা
রাতকে মাজছে টানা কাঁসার আবেগ

Monday, June 21, 2021

শিরোনামহীন ২


জ্যোতি পোদ্দার




পাতার ভেতর পাতা উল্টে পাতার শরীরে লিখি 
কতিপয় বিবমিষা

পাতাবোন তুমি পাতাভাই তুমি তোমার শরীরে আগুন;
আগুনের গুনগুন আর  লালে লাল রক্তজিভ
ঢেলে দিচ্ছে ঢেলে দিচ্ছে বিষভাণ্ড

আমি যে শোলার পুতলা মেলায় মেলায় ঘুরি
ও কারিগর ও কারিগর মরি মরি আমি মরি

 ও ডাকিনী ও যোগিনী কালরাত্রি অমাবস্যা
           এমন রাতেই তুমি শুষে নিলা প্রাণ?

লাল রক্তজিবে বুনো গন্ধ---গন্ধের ভেতর নরমুন্ড মালা
উড়ছে উড়ছে বাতাস বাতাসে ভাঁজকরা অন্ধকারে;

মুণ্ডহীন খাঁজকাটা পাতারশরীর
                                 মন্ত্রে নাচে
                                           তন্ত্রে নাচে
নাচে তান্ত্রিকের গোল গোল মাদকচাহনি

ও শিব শ্মশানবাসী  ওঠো তুমি ওঠো
                                  শব দেহ নিয়ে কী করিবে তুমি
খোল আলোর পরতে পরতে আলোভাঁজ
সাদা সাদা সাগুদানা আলোবিন্দু
                                     আর নয়া পয়সার ঝলক;

তুমি কাল কালীর যাত্রাবিন্দু।

আমি যে শোলার পুতলা মেলায় মেলায় ঘুরি
                                 আমি যে চিনির ঘোড়া
আমি যে চিনির হাতি
তাপে ভাপে চাপে পাতার ভেতর পাতা উল্টে
পাতার কোমলা শরীরে লিখি যাপনের বিবমিষা




















Friday, January 8, 2021

 অনিন্দ্য রায় 

____________

সকাল 

•

সকাল সাড়ে সাতটা

ডুরে-জানলার পাশে কালশিটে গায়ে রোদ পড়ে আছে
                   আর তার মনিবের মতো এক আরামকেদারা

দৃশ্যত শরীর— স্পর্শের চাহিদা মতো হাতল ও উত্তল পিঠ 
কাঠ, আদি বার্নিশের গন্ধ, একাকীত্ব, ঘোর      
                               মনে পড়ে মধ্যতিরিশ

বসি পর্দা টেনে, হাতে মান্দেলস্তাম 

পা থেকে পোষ্যটি যত সরে যায়  
    কোনও মুমূর্ষু কবির লেখা মনে রাখার দায়িত্ব                            আমার ভেবে বিচলিত হই  


বিকেল 

•

বিকেল পৌঁনে ছয়

বাঁধের পশ্চিমপাড়ে অর্জুনগাছের তলায় এসে বসেছেন 
বাঁকুড়া জেলার গ্রীষ্ম 
শ্রান্ত, কপালের ঘাম হাওয়ার গামছা থেকে নিঙরে তিনি হাই তুলছেন  
আর বাঁশঝাড় মরমর করে উঠছে 

হাঁসের পেছন-পেছন-ছুটে-আসা আদুড় বালক হঠাৎ দেখল  
ঝোপের ভেতর আকাশে ওঠার আগে চুল আঁচড়াচ্ছে লক্ষ্মীট্যারা চাঁদ          
 
আমরাও খেলা ছেড়ে ওদিকে এগোই

আমরাও কবিতা লেখার জন্য অন্তত একবার 
                   মঙ্গলকাব্যের মাঠে ঘুরে আসতে চাই   


প্রভু দাও দ্বার খুলে-'

বিশ্বজিৎ  লায়েক


১)

সঙ্গম ক্লান্ত শরীরে আজ অঘ্রাণ মাসের বিকেল

মাঠ ভর্তি ধানের গন্ধ নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব

কিসে ডুববে আমার উচ্ছ্বাস

চাঁদ গলে গলে এই যে রেখে গেলে অজস্র মোম

রেখে গেলে লক্ষ্মী কোজাগর

এখানে দ্রাবক নেই, হলুদ সাদা জীবনের উপর 

ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাম, দ্রাব আর বিষণ্ণতা

রমণী শীত জানে না এইসব

সে শুধু কুড়িয়ে আনে আমাদের শীতের ওম


২)

তুমি আর মন খারাপ লিখো না, লিখো অনন্ত খিদে

তুমি আর জলে ভাসো না, ভাসাও শরীরে আহা মন

আমার লুকিয়ে রাখা হাহাকার

আমার অন্ধ জন্মের প্রতীক 

এই মগ্ন অন্ধকার

রাখো তার ডানায় শুদ্ধ পালক, গত জন্মের উচ্ছ্বাস



৩)

ধানের মতোই বেড়ে ওঠো তুমি

কালো ধোঁয়া আর বঞ্চনার এই চ্যালাকাঠ

ছোটো হে অন্ধ মাতাল, মুগ্ধ প্রেমিক 

শব্দ ছুঁয়ে হও দিগভ্রান্ত

বুকের ভিতরে কে যেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে ধিকিধিকি

কাঠের আগুন

যুদ্ধের বিপরীতে অন্য যুদ্ধ খেলা


৪)

পারফিউমের গন্ধে কাঁদতে কাঁদতে নেমে গেল শ্যামল ছায়া

শরীরে তার ধোঁয়া, কার্বন ও গন্ধক

কৃষক রমণীর দেহজ প্রসব

অকল্পিত অসুখ







৫)

এই বয়ঃপ্রাপ্ত নিড়ানি চারাধান

ক্ষেতের আলে ফুটে ওঠা অসময়ের চাঁদ

ধানের আহ্লাদে তুমি নাচো শস্য শ্যামলিমা

ক্ষুৎ কাতর এই দেশে

ধানের আহ্লাদে মিশে যাও তুমি চুম্বনের মতো

টিপে দেখো তার মসৃণ ফলের মতো স্তন


৬)

কৃষকের করতল 

এই দেশ পিপাসা তর্পণ

পাতায় পাতায় রাখো অবশিষ্ট যৌণ বিদ্যুৎ

অভিষিক্ত নদ-নদী

অভিসারে রেখেছ যে মন

চাষীর খোয়াবে নাচে যে লকলকে সবুজ

কচি ধান

দুটি ঠোঁট ছুঁয়ে আছে জলে

জলের অক্ষরে

ভালবাসা তুমি গড়িয়ে নামো আলো আর আঁধারে

কথার ঠোঁটে, ডুব সাঁতারের এই রাত

মিশে যাও আমার নির্বাক ছুঁয়ে থাকা কচি ধানের দুধে


৭)

পুড়ছিলাম, বহুবার আমি পুড়ে পুড়ে

কাকে যেন বলেছি

ভালবাসা দাও সঙ্গে সামান্য অবহেলা

শিউলি তলায় পড়ে থাকা জবাফুল

কুড়িয়ে নিয়ে তাকে বল

এই দ্যাখো প্রেম এখানে কচি ধানের দুধ

এই ভালবাসা গ্রহণে অক্ষম তুমি

দূরে থাকো

তোমার বিষণ্ণতার দিকে চলে গেছে আমার আঙুল



৮)

তুমি হেসে ওঠো

অনেক উঁচুতে তিনি লিখছেন

ফেসবুক

আমার শৈশবে জমানো স্বরবর্ণ রাত

আপাতত বৃষ্টি দিন, উদাসীন ওম

কতকাল বসে আছি শালপাতা নিয়ে

প্রাচীণ অরণ্যে

'ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে'

রুগ্ন ভালবাসা তোমার কোনো ব্যঞ্জন নেই

আলাদিনের পুষ্টি নেই

নিষেধের বাড়িঘর

যতবার চেয়েছি তোমাকে

ঘুম ও স্বপ্নে মতিভ্রম

জেগে আছেন বোবা ঈশ্বর



৯)

শুয়ে থাকা চাঁদ নিয়ে

রাত নেমে আসছে জিহ্বা ও জ্বরে

মৃত হারমোনিয়াম

শীতের স্টেশনে বাজাও তোমার অসুখ-বিসুখ

অসময়ে অতটা খিদে গান হতে চেয়েছিল

আর আমি বৃত্তের বদলে জিরো বসালাম

শুয়ে থাকা সর্বনামে


১০)

মাইগ্রেন নয়, শ্বাসকষ্ট নয়, উল্কি

বেচতে এসেছি তোমার শহরে

তুমি বোতাম খুলে পাঁজরে সেলাই মাখালে

জিভের নোনা আল স্বাদ


১১)

সাদা পৃষ্ঠার আগে বাষ্পমোচন

সাদা পৃষ্ঠার আগে বিনোদন লজ

সাদা পৃষ্ঠার আগে রাত নেমে আসছে

শরীরে আবার







১২)

কী নিয়ে বসে থাকব আমি

দরজায় হেলান দিয়ে বসে আছে ত্রয়োদশী চাঁদ

কী নিয়ে বসে থাকব আমি

শূন্যঘর একাকী একা...


১৩)

আমি কি ভাঙা আয়নার টুকরো টুকরো ভেঙে যাওয়া কাঁচ

জোড়া লাগাবে বলে সকালে এসেছিল

বন্ধুর মতো প্রিয়জন

দুপুরেও কেউ কেউ এসেছিল নিশ্চয়

আমি ঘুমোচ্ছিলাম

বিকেলে যারা আসব বলেও এলো না এখনও

ঠোঁটে আলকাতরার জ্যোৎস্না মেখে বোবা হয়ে গেছে

চিরকাল


১৪)

আমি কি আরো ভেঙে ভেঙে টুকরো হয়ে

নিজেই নিজেকে লাগাচ্ছি জোড়া

হাত-পা, পেট-পিঠ, মুখ

শরীরের শিরা


১৫)

এতরাতে কে এলো ঘরে

সারা শরীরে তার অক্ষর মিছিল

'মানুষ পারে না।

এক জায়গায় এসে স্পষ্ট ভেঙে পড়ে।'


শৌভিক কুণ্ডার কবিতা 

অভ্যেস 



বস্তুত অভ্যেস জুড়ে ছুঁড়ে দাও
"কেমন আছেন? " অথবা, "ভালো তো?"
আর উত্তর না জেনেই হেঁটে যাও নিজস্ব দ্বীপের ঝিনুকে।

অথচ আমি তো হাত বাড়ালামই,
কাঁধ ছুঁয়ে বলবার ছিলো,  "আহা! তুমিও কেমন?"
বলতে চেয়েছি, "জানো, কাশবনে আর নেই বালিহাঁস 
প্রজন্ম পেরোনো ঘাসও
চুপ হয়ে গ্যাছে। "
এইসব গুঁড়ো কথা শুনবে না বলে
তুমি চলে যাও
প্রশ্ন ধুলায় থাকে স্রেফ অভ্যেসে।




পাহাড় 


একটি রঙের গল্পকথা লিখতে চাইছি বলে
টুকরো টুকরো পান্ডুলিপি দেরাজ ভরে রাখি
হারিয়ে ফেলার ভয়ে
শব্দে শব্দে প্যালেট সাজাই উন্মুখ প্রত্যয়ে।

পাহাড়, আমি তার দিওয়ানা 
পাহাড় বনতে চাই
বৃষ্টি দামাল, ধ্বস নেমেছে
স্বপ্ন ভরে ছাই

পাহাড়রঙা গল্পকথা খাদের মুখে বাঁক
ফ্রেম ছাড়িয়ে চুল এলিয়ে একলা জেগে থাক।

অপরা কবিতা

চিরঞ্জীব হালদার

 কে কাকে আর ভঙ্গ করে বলো কী বা ভঙ্গ করার আছে গুন
অযোধ্যার পাহাড়ে বসে একা দেখিতেছো ভার্চুয়ালই মুন
কাঁথা বোনা বুড়ি নিরুদ্দেশ বুকে ধারণ করো কাঁথা স্টিচ
নিম্ন বিত্ত অন্য অাগুন জ্বালে চোয়া ঢেকুর জ্বালায় পেটের নিচ।
ক্রম ভাস্বর আলোর কথা বলো দুত্যি কি আর মাপ তে পারে রিপু
হরধনু ভঙ্গ করে নাঙল চালায় দেখ পাশের বাড়ির দিপু।
দিপুর আছে আমডাঙার ই মাঠ দিপুর তেঁতুল পাতায় আছে সুজন
সম্পর্কের মধ্যে দ্রিদিমি বাজে ফলিডলের স্রোতে ভাসে দু'জন।
থ্রি কোয়াটার  পেগের পরে চাঁদ উঠেছে দেখো জোৎস্না নিরুদ্দেশ
রিবন সুতোয় ঝুলছে জন্মদিন হেসে ওঠে কলঙ্কিত কেশ।

মন্থন 


ইহা সমস্ত।এবং সম্মত।নাড়ু পাকাইবার জন্য।কোথাও কোন অবশিষ্ট নাই।
বারকোষ টি সোনার বা কাষ্ঠের। উপাদানেরা শায়িত।নিদ্রা মুখর।উৎসবী।যথা সময়ে জাগরণ দেওয়া আবশ্যক।
বায়ু কণা আছে। যেমন থাকিতে হয়। ধার্মিক আছে।তার দন্ড টি অদৃশ্য।তাহার ও একটি কর্তব্য স্থির। কেহ জানেনা।ঠিক সময়ে নাকি সূচি দ্বার
ভেদ করিয়া কিছু একটা নির্গত হইবে।
আপনি ভাবিতে থাকুন।ভাবনাই আপনার সমূহ কর্তব্য।বাসায় বিদ্যমান থাকিবেন।না থাকাই ধর্মের অন্তরায়।
এক্ষনে যাহা বলা হইল। তাহা বলা হইল কি।
আপনাকে বলা হল নায়ক।যুদ্ধাস্ত্র নেই। চুম্বক আধার নেই। জিঘাংসা নেই। আপনি নায়ক।
আপনি প্রলুব্ধ। প্রলোভিত। নিত্য বর্তমান।
হেমকনা। ফুলেরা জয়গান করে।মুগ্ধ প্রজাপতি।
পরাগবহনী মাত্র।
হে ঈশ্বরী।ঈশ্বর ক্ণা। দাড়ি। কমা। রেফ। বিসর্গ। বিন্দুচন্দ্রে জাগ্রত।শুধু পাকানোর অপেক্ষা মাত্র।
হে দাসী। হে দ্বারী। হে নৈতিক কারুকর্মা। 
আপনাদের পদ ব্যাতিরেকে এই নাড়ু কর্ম।নাদ ও স্রোতের মধ্যবর্তী। শুধু হেতু আখ্যান বলার অপেক্ষায়। প্রসবিত প্রহর।
দেখুন অষ্ট চন্দ্রমা।দেখুন। আপনারা আসন গ্রহন করুন রাত্রিনাগর।

৩- নভেম্ব র-২০



বান্ধবধর্ম


হাস্নুহেনার নিচে দাঁড়িয়ে দিনের ধর্ম ত্যাগ করার
 পর  ধর্মরাত্রি কে বলি 
মার্জনা করবেন।
আমার শিকড়ের স্বপ্ন গুলো সিফন
 পরিধানে এক একজন অবধূত।
আপনার বুলন্দী আসবাব উত্তরীয়ের পাশে
যাযাবর হরফের গুলতানির এরা সফল অনুবাদক।

আপনার থেকে এক কুনকে রাতশষ্য ধার দেবেন।

আমি অঙ্গীকার বদ্ধ ইহাদের সব ফুল 
পাখি জন্মের দিকে নোলক ঠোঁটে উড়াল দেবে।
ভালো থেকো মানসবান্ধবী।

 অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা 


১) 

মধ্যিরাত আর মধ্যিবয়স
বাড়িয়ে তোলে আত্ম-সন্দেহায়ন।।
নখের দর্পণে যার ছবি ভেসে ওঠে,
সে আমি নই, ছিলাম না কখনো!  

২)

স্মরণ যখন শ্রবণ হয়ে ওঠে,
মনে হয় সবাই জানে
বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখন
চৌরাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবো।
দেখতে আসবে সকলে,
আর না দেখেই চলে যাবে,
শব্দ হয়ে, স্মৃতি হয়ে,
রয়ে যাবে,
লোহিতরক্তকণিকা।।

৩)

একা মানুষের
সমবেতসঙ্গীত
ফুরোনো পর্যন্ত
ভরোসা থাকুক
বন্ধ দুয়ার খোলার।।

৪)

গানটা গেঁথে রয়েছে মগজে সারাদিন।
যতক্ষণ না মনে হবে,
যেটা গেঁথে আছে সেটাই তো মন।
মগজে গানের মতো গেঁথে থাকে,
সারাদিন সারারাত।


৫)

আলমারির বন্ধ দিকটায় তোর গন্ধ পাই
গন্ধ পাই বলেই খুলি মাঝে মাঝে,
ঐদিকটা।
গন্ধ পাই বলেই তো সবসময় খুলি না,
ঐদিকটা।
তুই বলিস,
গন্ধ বুজে আসে সময় ভর করলে
নতুন সংক্রমণেও নাকি গন্ধ উবে যায়
তাও আলমারির বন্ধ দিকটায় তোর গন্ধ পাই।।
আমি ফাল্গুনী রায়ের সৌন্দর্য রাক্ষস নই,
ভেঙে ফেলতে পারিনি 'প্রজাপতির গন্ধসন্ধানী শুঁড়' ।।

Tuesday, January 5, 2021

 অরুণ পাঠকের গুচ্ছ কবিতা



দুর্ঘটনা


এখনও উত্তপ্ত দুহাতে ফুটন্ত গোলাপ তুলে ধরে

বয়সের প্রত্যন্ত ভার তুমি গোপন করে যাও

আকাশ তোমার দেহে গুলে গেছে রং

প্রহরী পেরিয়ে গিয়ে সামান্য বাগান মাত্র গেছি 

সেখানেই গরীয়সী বহুলাংশে আমার হয়েছ

মায়ের আসল রূপ মাটিতে বা মেঘে একই বৃষ্টির

কারসাজি 

যোনি প্রবাহিত হয়ে আলোর দরজায় 

উপগত আমি যোনিতে প্রবেশ করে আবার জন্মাই

স্বয়ম্ভু শক্তির গায়ে এমন রূপের মাটি

তোমাকে মণ্ডপে আনে কিংবা বিছানায় 

আমি বাইরের লোক; আমার নকল ঘরে

তোমাকে পেয়েছি, যে ঘর বিমূর্ত ছিল সূর্যাংশের

আগে

যখন ধারনা ছিল, অনুভূতিযোগ্য কোনও 

মেধাবী নারীর জন্য সূর্যতারকারও একটা

দুর্ঘটনা দরকার... 




দেহ


যা-দেখছি তা-সত্য নয়, মর্ম খুব শ্লথ

বেঁচে থাকার মহত্ত্বে আমরা তো বিশ্বাস করি 

এই ধবল সাধুতা সমান্তরালভাবে বইছে দেহটি 

মাথাটি গণক আর মধ্যমার চিরায়ত ভুল 

জীবন তো মৃত্যুর উঠোন, ভাই-বোন আত্মার বিভেদ

সব এক হয়ে চলে আসে প্রথম সারিতে

আমার রক্তের রং আমাকে বিশ্বস্ত করে

অথবা সে চিন্তার পাহাড়, যা অন্নের অভিমুখ

প্রকাশিত করে, কখন যে শুরু হবে

দেহ তার কিছুই বোঝে না, ভাগ্যের ক্রীড়ণক নয়

এই দেখো জিহ্বা স্বাধীন, বাক্ও স্বতস্ফূর্ত 

শুধু আলোকে অসীম করে দাও, সহ্য করো

প্রতিবিম্ব তার, কলের লাঙল থেকে মেধার কলমদানি 

প্রযুক্তি আমার কাছে আদিমতা চায় প্রথমত



অর্জন 


আমি কোনও বস্তুনাম এ জিভে নেব না

দেহের ভেতরে যে অনন্তের খেলা, তরঙ্গসুলভ

তাকে প্রাকারের নিচে রেখে শাসন করব

কখনও কখনও তুমিও উদ্বায়ু একটা বিশ্বের মতো

ফুটে উঠবে আমারই নিয়ন্ত্রণে 

তুমি, জগতের সংযোগ সাধিকা

একমাত্র আত্মপরায়ণ আমাকে বিশ্বলগ্ন করেছ

তাই, তুমি সঙ্গে থাকবে আর অধীর নিয়োগপত্র হাতে

পরমার্থের গতিকে স্তব্ধ করবে ধূলায় ধূলায় 

উচ্চ ধীশক্তি ও আত্মসচেতন 

এক মানুষ, তাকে এক নির্জন নদীর মধ্যে রেখে

আমার এই হাওয়া মোরগের কারখানা 

হাওয়া বিষাদগ্রস্ত হলে

আমার কিছু যায় আসে না 

আমার নির্ণয় নিয়ে মর্তুকামী মানুষেরা নাচে গায়

উদাত্ত এ গ্রহবর্ম আঁটা শেখান স্বার্থের লোকজন 

ব্যাধিগ্রস্ত দৃষ্টিতে তোমাকে চায়

তুমি সাধন নিয়ন্ত্রা 

রক্ষিতা শব্দের 

স্বনাম অর্জন করে এসো


পাত্র


এ পাত্রে গোছানো আছে হিরণ্ময় আলোটি উজ্জ্বল 

বিশ্বাসে ও বীজ আলোর রক্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে কোষ

এইখানে মরণ অভ্যাস আলোকিত মঞ্চের ওপর

দুপুর গড়িয়ে আসে, তবু সে প্রভাত হতে চায় সবিশেষ


অনন্ত শব্দের ক্ষোভ অভ্যাস ঝাঁকিয়ে দিতে চায় 

ধরে রাখি ফুলের প্রদীপ, প্রজ্জ্বলিত হাতে হাতে 

একা ফুল উৎসে টেনে নেয় সকারণ জীবন বিদ্বেষ 

শেকড় আলোকে টানে মাটির গভীরে, সেখানে উদ্ধার


কালো রাস্তা, ভালো রাস্তা, ছিল, আছে আছে

প্রকাশ্য সংগত সেই দিনের হিসাবে মেঘান্ধ আকাশ 


 নামহীন লেখাগুলি

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

১.
রাত্রির জন্য কিছু ফেলে রেখেছি । 
পুড়ে যাওয়া একটি সাময়িক ব্যাপার। ছাই কত জন্ম দেয়। বিশ্বাস করো। শেষ থেকেই শুরু হয়। 
২.
কাউকে ডাকতে হয় না কোনোদিন। শুধু অপেক্ষায় থাকো। 
উপেক্ষা করো ভ্রুকুটি। দৃঢ় পায়ে
তারা আসছে। একটু সঙ্গ দিলে সংঘ গড়ে ওঠে। 

৩.
ধ্যানের ভিতর টুকরো টুকরো দৃশ্য। 
শান্ত কখন অশান্ত। ক্ষোভগুলি কখন ক্রোধ। এক অবিশ্রান্ত মিছিল। মিথ আর মিথ্যা ভাঙবার
পর অনন্ত সত্যের দিকে ধাবমান। 
মানুষের কাছে যেতে ইচ্ছে জাগায়

৪.
আমি ঘুমিয়ে গেলে তুমি দেখতেই
থাকো। স্বপ্ন চোখে আঁকা। এই অসুখের পৃথিবীতে ভালো কিছু
ভাবনা জড়ো হয়। খুব করে আঁকড়ে ধরো। ধরিত্রীর গভীরে সুপ্ত
আনন্দ। স্রোতে ফেরো

 

প্রনব রুদ্রর কবিতা (গুচ্ছ কবিতা)

অরণ্যে ধূসর ফুল


জীবন এমন এক অপঠিত বই যার
ইচ্ছে এবং মূল চরিত্র প্রায়ই সব জানা 
তথাপি তার সব বাঁকগুলো বোঝা যায় না 
হিসাব বিভাজন সমীকরণ মেলেই না।

ঘাস মাড়িয়ে চলে যায় জীবন্ত কষ্টগুলো 
ঘাস জুড়ে থাকে ছোটদের, ছোট প্রাণীদের
জীবন নাড়িয়ে যাওয়া অসংখ্য ডালপালা।

আমার সমস্ত দেহে চেনাশোনা কত ভুল
ভালোবাসা নয়, ভুল পাপে বাড়ে কষ্টদল।
উত্তরণ পথ একদম পরিচিত নয়
আস্তে ধীরে খুলে যাচ্ছে সম্পর্কের প্রচলন। 

ছেড়ে দিয়েই ভালো থাকতে শিখে যাচ্ছে মন 
জীবন তোমাকে আকাশ থেকে পাখির চোখে
এক পলকে পুরো দেখার বড়ো শখ হয়। 


###


সুখ নেই সংসারে 

রোদের গায়ে রোদ না জ্বললেও মিথ্যে সত্য শুষে নিতে পারে।
সম্পর্কের অভিমানী শীত কিছু উষ্ণতা গোপনে বুকে রাখে
বিকেলের নরম বারান্দা পাল্টায় আগ্রহ, নির্বিকার মন।

সত্য লুকানোতে বিষে জ্বলে যাচ্ছে সংসার যাপনের মিষ্টতা
অন্তর তো জানে নিজের ও অন্যের সততা কতটা ফুলেল।

দিন দিন ফুল ফুটে সুখকে বিস্বাদ করে ঝড়ে যায় সব
কুসুম বাসনা জীবনের প্রেম কাউকেই বিশ্বাস করে না
আয়ু শেষ করা মিথ্যা আশ্চর্যরকম প্রভাব খাটায় পথে।

কিছু মানুষ বিজ্ঞান জ্ঞানে তর্ক করে না, করে মুর্খামি নিয়ে
ঈশ্বর জানেন কত ব্যথা বুকে শুয়ে থাকে আমার বিছানা।

সুখ মেয়েটির নাম যদি হয়, এখন বুঝতে পারি তবে
মনোরোগ মনেরই তার, মেয়ে সম্পর্কে মিথ্যই বড়ো গল্প।

যারা পুঁতে দিয়েছে মাকাল ফুলটি শুধুই প্রতারণা জানে,
একদিন আপনত্ব ভুলে জনশুন্য ঘরে বায়ুই তাদের
নির্মম ব্যঙ্গতার যাবতীয় যন্ত্রণা দিয়ে পাগল বানাবে। 

###


ঝড়ো দুপুর 

খাবার যেন উগ্ লানো বমি, পাতা শূন্য গাছ ফলহীন;
পেছন ফিরে আছে শীতল দুপুর, হাতে রক্তদাগ!
সমস্ত পান্ডুলিপি প্রেমিকার ঋতুকালীন লাল
মিথ্যে আদতে বাড়তে থাকা মাকড়সার জাল।

নানাবিধ অপূর্ণতায় ঘরে ঝুলকালি
নুন জীবনে ভাঙা একাধিক শুন্যতা
কোনটা যে মৃত্যুর সহজ উপায়- দড়ি না বিষ?
কোনটা বাঁচার বীজ- ভালোবাসা না প্রতারণা?

দৃশ্যত্ব আড়ালের ঝড় চোখের মাপকে বিদেহী
নিপুণ নির্মাণে বিখ্যাত হবো বলে আয়না দেখি না আর 



 ঝড়

 নীপবীথি ভৌমিক



  মাঝে মাঝে ঝড় ওঠা ভালো!
    খুলে যায় মুখ আর মুখোশের দূরত্ব     অবলীলাক্রমে

    এই যে ভরা শ্রাবণ এখন,
   অথচ অকাল  বৈশাখী  আকাশ এসে থমকে দাঁড়ায়   চৌকাঠ থেকে চৌকাঠে!

      ঝড় উঠবে জানি এবার। প্রবল ঝড়।
  উলটে পালটে যাবে সব মৃত্যুমুখী হাহাকার
    ঘরদোর ভাসিয়ে...

      মাঝে মাঝে ঝড় ওঠা ভালো,
           এই শ্রাবণেও ;
   সেতু ভেঙে যাবে ছায়া থেকে ছায়ার অবয়বে
       ‌‌  দীর্ঘ বিরতিহীন বর্ষা নিয়ে ।

      ‌‌তবুও কি আর ছেঁড়া ঘর সেলাই করা যায়
    বলো, মেঘের সুতো দিয়ে !

Sunday, July 26, 2020

পার্থ সারথি চক্রবর্তীর দুটো কবিতা 



   ১৷     ঈশ্বরী 
     

চোখের পাতা থেকে খসে পড়তে দেখেছ
              একফোঁটা জল,  মুক্তোর মত।
কিংবা আকাশ থেকে একটা দলছুট তারাকে।

অনুভূতির রিখটার স্কেলে মেপেছ কখনো 
               হৃদয়ের কম্পন, অব্যক্ত ব্যথা ।

জানি, তোমার ও সীমাবদ্ধতা আছে, 
তাই বলে ঈশ্বরী হবার চেষ্টা ছাড়বে না;
নাকি জনমদুখী নারী হয়েই থাকবে !


   ২৷     আবর্তন   
        


আকাশের দিকে তাকিয়ে দু'দন্ড শান্তি পাই

ভেসে যাওয়া কালো মেঘগুলো যেন 
আমার যাপিত দিন, দন্ডিত জীবনের।
পিঁপড়েরা মিছিল করে কষ্ট মিনারের অভিমুখে ।

ওদের পিঠে জমে অবসাদের ক্লেদ

আর যন্ত্রণার কক্ষপথ ধরে,
মেঘগুলোকে জাপটে আবর্তিত হতে থাকি
আজন্ম,  আবহমান কাল ।

অনিন্দ্য রায়ের কবিতা


সহজে ফুটকি লিখে

সহজে ফুটকি লিখে শূন্যকে বসাই আগে তার
এই তবে দশমিক, পিছু পিছু রাশিরা হাজির
সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে, মাথা নীচু, একেবারে স্থির
ঘাড়ের ওপরে কারো দশ, কারো একশো, হাজার 

এভাবে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি? এভাবেই অপত্য জন্মায়?
বাড়তে থাকে অর্থনীতি? আরও বড়ো মানবসভ্যতা?
এভাবে ছড়িয়ে পড়ে চরাচরে জীবনের চোতা
বিস্তারিত হতে হতে অনন্ত পর্যন্ত গেছে প্রায়

সমস্ত কিছুর জন্য লাগে একমাত্র দশমিক 
মাত্রা নেই, মুখচোরা, চট করে পড়বে না চোখে 
উহাকে চেনাতে সামনে খাঁড়া হতে হয় যে শূন্যকে 
তিনি বিন্দু টপকে ক্রমে করে নেন দখল ওদিক 

আমরা শূন্যের প্রজা, রোজ তাঁকে কর দিতে হয় 
তুমি যা ভগ্নাংশ বলো, তার মানে জ্ঞানীও তো হয়

এই যে বলছেন

এই যে বলছেন, “লেখা বন্ধ করে দেব অনিন্দ্যর”
এই যে গ্লাসের মধ্যে পড়ে যাওয়া পোকাটি অবাক 
শুনছে আপনার কথা, কানেকশন, খিল্লি, হাঁকডাক
“পত্রিকায় ওর লেখা ছেপেছিস! বুদ্ধি নেই তোর?”
কবিতা পাঠের পর সন্ধ্যাবেলা হোটেলে হুল্লোড়
রয়্যাল স্টাগের দাম মেটালেন, প্রভূত দেমাক
দেখিয়ে সবার সামনে খুলে যাচ্ছে কবির পোশাক
টেবিলে কবিতাবই, চাপা-দেওয়া একটি পাথর

কোথায় উল্লাস হবে, নাচ হবে, উড়বে কবিতা
তা নয়, আমার নাম! প্রিয় কবি! মটকা গরম
আমি থাকি বহু দূরে, মফসসলে, বুঝেছেন কি তা
আমাকে হত্যার জন্য ফালতু তো আপনার শ্রম

আপনি বিখ্যাত লোক, কেন যে আমার নাম বাদ 
দিতে গিয়ে জনেজনে চিনিয়ে দিচ্ছেন… ধন্যবাদ   

নয়নতারার ঝোপে

নয়নতারার ঝোপে হারিয়েছে আলো
স্যাঁতস্যাতে ছায়া, চুপচাপ শুঁয়োপোকা 
পৃথিবীর থেকে সরে এল সমকালও
পাতাদের পাশে আশকারা থোকাথোকা
বিষাদের রস চোখেমুখে ছিটকালো
সেটুকু নিয়ে তো আমাদের লেখাজোকা
তুমি মেটাফর, নিরিবিলি, একরোখা 
তোমাকে না-ধরে পারি না দাঁড়াতে ভালো

দাঁড়ালে মাথায় আকাশ যে ঠোকা লাগে 
ছোটো হতে চাই, যেটুকু না-হলে নয়
মিশে যেতে চাই জীবাণুর সংরাগে     
উপমায় ভুলে গেছি নাম, পরিচয় 
শুধু মনে আছে তোমাকে, খুনের আগে 
‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’