Wednesday, March 28, 2018

ব্রহ্মজিৎ সরকারের কবিতা

কিছু করার নেই 


নিবিড় তাকিয়ে আছি 
তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই আমাদের
ব‍্যাগি চাক্ষুস ল‍্যাং মেরে পা ভেঙে দিলো 
মাঠে জ্বললো আগুন 
জমি থেকে লাঙল এলো ছুটে 
ঘর থেকে বেড়িয়ে পরলো সাপ 
ভিড় ছাড়ালো মাঠ 
আটকে গেল চাকা 
পুলিশ এলো ধীরে 
ইট-পাটকেল আকাশে বাতাসে...
এমন মোচ্ছবে স্ক্রীপ্ট লিখবে বলে 
তীক্ষ্ম তাকিয়ে আছে 
এক ঝাক শেয়াল...
এছাড়া কিছু করার নেই ওদের ।



বিকাশ সাহার কবিতা 

কুহকিনী বিষয়ক উচ্চারণগুলো 

             বিপ্লব সরকার

বিকেল ফুরোতেই কুহকের ঘোর লেগে যেতে দেখি 
কাশিয়াবনে 
উৎসের দিকে মুখ করে অনন্ত যাত্রা
ক্রমশ গাঢ় হয় জ্বর। জ্বর হলে মনে পড়ে ভাঙা বেড়া 
ঝড়ের দাপটে যার খুলে যায় গিঁট এবং 
শ্রাবণমাসে দ্রবীভূত----------ঘুম
আজকাল তাই বিকেল নামার আগেই ফিরি ঘর
দরজার কাছে টাঙিয়ে রাখি যাবতীয় নিষিদ্ধ উচ্চারণ 
আর বেড়ার উপর প্রতিটা সন্ধিচিহ্ন বরাবর লিখে রাখি
মধুচক্রী ঘ্রাণ
কিজানি কখন কোন সৌরতরঙ্গে মিশে ঢুকে পড়বে 
                                                       ইচ্ছেধারী প্রলাপ!

নববর্ষ
রুমা ঢ্যাং অধিকারী 


ক্যালেন্ডারের পিছনে - 
      সামান্য ডিমড যে  ক্যালেন্ডার
তাকে বলি বয়ে যাওয়া ধুলোঝড় 
                                             ও বিষযাপন
কবিতার ছন্দে যে যুবতী উড়ে এল খুনে ইতিহাস পড়ে
         সে এখন খোলা রাস্তায় সন্ধ্যারাগের ছায়ায়
তার বিগত মাসগুলো থেকে 
                     এখন আর শিসের শব্দ শোনা যায় না

সামনের ক্যালেন্ডারে জ্বলজ্বল করছে দিনগুলোর রঙ
একে বলি পূর্ণাঙ্গ চন্দ্র 
                            ও রামধনুর ঐক্যতান
 তাকে ছুঁয়ে 
যুবতীটির গায়ে গা লাগিয়ে ভেসে যাওয়া

একটি অসাংবিধানিক আদর
------------------------
সুমনা ভট্টাচার্য 

পোড়া কাঠ আর মাংসের গন্ধ বেয়ে
কিছুদূর এগোতেই দেখি,
সুতীব্র চাঁদ বুকে নিয়ে তারা সারিবদ্ধভাবে
অপেক্ষায়, আগুনের।

ধীর পায়ে সারির শেষে গিয়ে দাঁড়াতেই
কে যেন বলে উঠল,
"এসো আমরা শোক করি,
প্রত্যাখ্যান আর অপমানের।"

চাঁদের আলোর উত্তাপে ঝলসে যাওয়া ক্ষত
আর একটি অসাংবিধানিক আদর
নিয়ে, তখনও আমি দাঁড়িয়ে নির্বাক,
আগুনেরই অপেক্ষায়।

উল্লাস
------



ছোট্ট মাটির পুতুল
তাকে ঘিরে দু'জোড়া লোভাতুর চোখ
আর ক্ষুধার্ত দ'জোড়া হাত
গনগনে আঁচে সেঁকে নিচ্ছে পোড়া মাংস
অবিকল শ্বাপদের উল্লাসে হাতড়ে নিচ্ছে সুখ

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে লজ্জিত আমরা
ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ।


বৈশাখী রায় চৌধুরীর কবিতা 
॥চোখ  সমন্ধীয়॥ 
১.
ডাক্তারবাবু বলেন দূরের জিনিস ঝাপসা হয়ে গেলেই বিপদ
কিন্তু আমি তো জানি 
যারা দূরে সরে গেছে
তাদের ঝাপসা করে দিয়ে 
রোজ কতকিছু শিখিয়ে দিচ্ছে চোখ। 
২.
তুমিও শানিয়ে নাও
হৃদয়জোড়া অন্ধকার
মোমবাতির কাছে হাতে পেতে চেয়ে নাও মৃত্যুশোক
মাথায় অবিশ্বাস ঠেকিয়ে খুলির ভেতরে ভেতরে ছড়িয়ে দাও ঘৃণা
রেকাবি ভরে হাসিমুখে দুগালে  যারা মাখিয়ে দিচ্ছে দূরত্ব
জেনে রেখো একদিন সবাইকে ঠিক চিনে নেবে চোখ।
৩.
চিৎকারের মতোই এখন ছড়িয়ে পড়ে শীতকাল
এ শোকরঙা বরফের দেশে 
আমি বার বার হারিয়ে ফেলি বাড়ির ঠিকানা
গুঁড়ো ধুপের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে চোখ
বইতে না পারলে বন্ধ করে দেওয়াই নিয়ম
বন্ধ করো, দেখো, শেখো
ঈশ্বর হয়ে ওঠা প্রতিটি গল্পের দেশে
যন্ত্রণা মুছে চোখ খুলে রেখে হেঁটে যায় চাঁদ সদাগর।

উড়োজাহাজ / রুদ্রশংকর 

বেশ কিছুকাল হল আমাকে অনুসরণ করে উড়োজাহাজের শব্দ;
আর ভাল লাগে না ! ভাল লাগে না আমার !
সেই ছোটবেলায়, আমাদের ছোট ঘরের আরও ছোট ছাদে উঠে
কত যে উড়ন্ত জাহাজের যাযাবর উড়ে যাওয়া দেখেছি,
আর ভাল লাগে না এখন !
#
ছোটবেলায় প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে অনুসরণ করত আমায়।
এমন সব অঙ্গভঙ্গি করে আসত,
যেন আমার মাথার মধ্যে নড়ে উঠত রূপসী কৌতুহল।
ঘুম ভাঙলে দেখতাম পোষা পায়রাদের সংক্ষিপ্ত উড়ে যাওয়া ,
সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ওড়ার রুগ্ন ইচ্ছে হত আমার।
 #
কোন সফলতা নয়, প্রশ্নের কঙ্কালগুলোর নিয়ে যে যা বলত;
আমি না ভেবেই পকেটে পুরতাম তাদের।
পাশের বাড়ীর পারভেজ চাচার ছোট মেয়ে তামান্না, 
হাজার হাজার কথা সাজিয়ে আমাকে বোঝাত
কিভাবে তার আসমানী কিতাবে আছে উড়োজাহাজের কল্পনা !
তখন আমার নির্বিকার দেওয়ালের ধূসরতায় 
স্বচ্ছ জলের মতো পরিষ্কার নবী সাহেবের মিরাজ যাত্রা।
#
গ্রামের মঙ্গল পুরোহিত, যিনি প্রতিদিন নিয়ম করে গরু চড়াতেন
সুযোগ মত আমাকে শোনালেন রাবণ রাজার পুষ্পক রথের গল্প।
আমি জানলাম এখান থেকে উড়োজাহাজ এসেছে আমাদের !
উজ্জ্বল সিঁড়ির উপর বসে উড়োজাহাজের জোড়া আবিষ্কারক
কখনো নবী সাহেবে, কখনো রাবণ রাজার কথা ভাবি,
আনন্দে তাক-ধিন ধিন-তাক নেচে ওঠে মস্তিষ্ক।
#
এইভাবে আমার হলুদ দিন, সবুজ দিন কাটত ছোটবেলায়
ভূতের  মত, ঈশ্বরের মত বিশ্বাস করতাম রূপকথার গল্পদের।
যেদিন প্রথম রাইট ভাইদের নাম শুনলাম,
চোখের সামনে ভেঙে পড়ল বিশ্বাসের মসৃণ পরমায়ু ।
নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারিনি তখন ;
কচ্ছপের হাঁটার চেয়েও ধীরে গতিতে বুঝেছি
আর পাঁচজনের মত পাখি দেখে ওড়ার কথা ভেবেছে রাইট ভাইয়েরা,
আজো দেখি পাখির অনুকরণে উড়ে চলেছে উড়োজাহাজ ।